Showing posts with label ব্লগরব্লগর. Show all posts
Showing posts with label ব্লগরব্লগর. Show all posts

Thursday, January 27, 2022

তার অন্ত নাইরে

সাগর সেনের রবীন্দ্র সঙ্গীত আমার বিশেষ পছন্দ ছিল। ফার্মগেটের মোড়ে ছিল আলাপ ইলেকট্রনিক্স। ক্যাসেট বিক্রি ও রেকর্ডিং করার দোকান। ক্রেতাকে আকর্ষণ করার জন্য সারাদিনই গান বাজতো। কোন বাছবিছার নেই ইংরেজি গান, রবীন্দ্র সঙ্গীত, ব্যান্ড সঙ্গীত, বয়াতির গান কিছুই বাদ যেতো না। সত্যিকার অর্থে গানের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। ৮০ ও ৯০ এর দশকে নিজের পছন্দের গান ক্যাসেটে রেকর্ড করার চল ছিল। ঢাকাতে বিভিন্ন লেভেলের গান রেকর্ডিং করার দোকান আছে। রেইনবো, সুর বিচিত্রা কুলীন শ্রেণীর। সেই বিচারে আলাপকে সেকেন্ড ক্লাস বলা যায়। তবে রবীন্দ্র সঙ্গীতের কালেকশন বিচার করলে আলাপ প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হবে। 


আমি তখন সাগর সেনের গান শুনি, দিনে পাঁচটা গান শুনলে দুটো থাকে তাঁর। আলাপে সাগর সেনের গাওয়া সবগুলো গানের রেকর্ড আছে। লং প্লের উপরে সৌমদর্শন এক ভদ্রলোকের ছবি, ব্যাকব্রাশ করা চুল, মোটা কাঁচের চশমা। বয়েস ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। অল্প বয়েসে প্রয়াত হয়েছেন, পাকস্থলির ক্যান্সারে। আমার মনে হতো রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়ার জন্য ওনার গলাটা বিধাতা নিজ হাতে তৈরি করেছেন। আলাপে সাগর সেনের গাওয়া ৮৪ টি রবীন্দ্র সঙ্গীত ছিল, আমি সেগুলো সব টেপে বন্দী করেছিলাম। সাগর সেনের কিছু আধুনিক গান আর সিনেমার প্লেব্যাক গান ছিল, সেগুলোও আমি রেকর্ড করেছিলাম। ভদ্রলোকের গলা মধু দিয়ে মাখানো। আমার গলাতে সুর ছিল না কোনদিনও। বেসুরো বললে কম হবে, আমি প্রায় অসুর। আমার মনে হতো সাগর সেনের মতো গাইবার ক্ষমতা থাকলে আর কিছুই চাইতাম না। 

বহুদিন সাগর সেনের গান শুনিনি। ইউটিউব আসার পরে আমার সংগ্রহে থাকা একটি গান আপলোড করেছিলাম। ২০১২ বা ২০১৩ সালের পরে ইউটিউবে বাংলা গানের জোয়ার আসে। যৌবন আমার লাল টমেটো থেকে শুরু করে ধর্মীয় গানই সব পাওয়া যেতে লাগলো। এই সময়ে একবার খুঁজে দেখলাম সাগর সেনের প্রচুর গান আছে। গানগুলো আপলোড করছেন তাঁর সন্তান প্রীতম সেন। প্রীতমের গান আমি শুনেছি ইটিভির আজ সকালের আমন্ত্রণে। খুব বেশি পদের লাগে নি, তবে পিতার সাথে সন্তানের তুলনা করাটাও অনুচিত। প্রীতম নিজে গান গেয়ে যা আনন্দ দিয়েছেন তাঁর চেয়ে অনেক বেশি দিলেন সাগর সেনের গানগুলো  ইউটিউবে আপলোড করে। সেই ৮৪ টা গান কবে কোন দেশে ফেলে এসেছি, কোন বিস্মৃতির আড়ালে!!! প্রীতমের গানগুলো প্রায় হারানো সুর ফিরিয়ে আনলো। আমি দেখলাম আমি সাগর সেনের গাওয়া প্রায় সবগুলো গানই শুনেছি। অল্প কিছু নতুন গান পেলাম প্রীতমের সৌজন্যে। 

রবীন্দ্রনাথ "তার অন্ত নাইরে" নামে একটা গান লিখেছিলেন। গানটি শুনলে আমার থার্মোডিনামিক্সের সূত্রের কথা মনে পড়ে। বস্তু আর শক্তির কোন সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই, শুধু এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থাতে রূপান্তর চলে। যে আনন্দে দিয়ে আমরা তৈরি হয়েছি তার আসলেই কোন অন্ত নেই, তার অণু পরমাণু প্রতিদিন রোদে পুড়ছে, জলে ভিজছে। আমরা শক্তি সঞ্চয় করি, স্মৃতি সঞ্চয় করি সারা জীবন জুড়ে। আমাদের মৃত্যুর পরে আমাদের এই নশ্বর দেহ মাটিতে মিশে যায়, তাপগতিবিদ্যার আলোকে চিন্তা করলে আমরা কিন্তু হারাই না। আমাদের সঞ্চিত শক্তি আরও বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পরে চারিদিকে। আমরা তখন গাছের পাতার সবুজ রং হয়ে যাই, তার ডালে থাকা পাখির কুজন হয়ে যাই। দেহের বাইরে গিয়ে আমরা সর্বত্রই মিশে যাই। পুত্রের মৃত্যুর পরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন 

"যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক্ আমার শোক তাকে একটুও যেন পিছনে না টানে।... শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্চে, কোথাও কিছু কম পড়েচে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি— সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে।" 

শোককে এমনভাবে দেখার ক্ষমতা সবার থাকে না, অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন তার বক্ষে বেদনা অপার। সত্যিকার অর্থে রবীন্দ্রনাথ গভীর দার্শনিক স্বত্ত্বাতে মৃত্যুকে উপলব্ধি করেছেন, বিজ্ঞানের মোটা বইয়ের সূত্রকেও ধারণ করেছেন সেই দার্শনিকতাতে। জীবন আর মৃত্যু দুটাকে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন আমাদের চেনা দুঃখ আর চেনা সুখের বাইরে গিয়ে। 

ফিরে আসি সাগর সেনে। তার অন্ত নাই গানটা ইউটিউবে খুঁজছিলাম। যে কয়টা পেয়েছিলাম তার কোনটাই তেমন ভালো লাগে নি (হেমন্তরটা ছাড়া)। এরপরে পেলাম মন্তব্যে দেওয়া গানটা। স্পেসিফিক শিল্পীর নাম দেওয়া না থাকলে আমি প্রায় নিশ্চিত যে এটা সাগর সেনের গলা। এই গানটির দুটো কপি আছে ইউটিউবে। একটাতে শিল্পীর নাম পূর্ণদাস বাউল বলা হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে সাগর সেনের গলাই মনে হয়েছে। কেউ কনফার্ম করলে আনন্দিত হব। 

আমার চেনা যেই দুই চারজন গান করেন, তাদের প্রায় সবাইকেই আমি এই গানটি গাইতে অনুরোধ করেছি। দুঃখের বিষয় কেউ গানটা গাননি। এলেম থাকলে আমি নিজেই গাইতাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্ভবত সাগর সেনের গলাতেই পেয়ে গেলাম গানটা। এক দম ভুলে যাওয়া সময়ের দুরন্ত আনন্দ নিয়ে এলেন তিনি। এই আনন্দ অতুলনীয়, এর আসলেই অন্ত নাই!!! 

তার অন্ত নাই গো যে আনন্দে গড়া আমার অঙ্গ।
তার অণু-পরমাণু পেল কত আলোর সঙ্গ,
ও তার অন্ত নাই গো নাই।

তারে মোহনযন্ত্র দিয়ে গেছে কত ফুলের গন্ধ,
তারে দোলা দিয়ে দুলিয়ে গেছে কত ঢেউয়ের ছন্দ,
ও তার অন্ত নাই গো নাই।
আছে কত সুরের সোহাগ যে তার স্তরে স্তরে লগ্ন,

সে যে কত রঙের রসধারায় কতই হল মগ্ন,
ও তার   অন্ত নাই গো নাই।
কত শুকতারা যে স্বপ্নে তাহার রেখে গেছে স্পর্শ,
কত বসন্ত যে ঢেলেছে তায় অকারণের হর্ষ,
ও তার   অন্ত নাই গো নাই।

Thursday, December 2, 2021

পরীক্ষা

পরীক্ষা শব্দটার সাথেই একটা আতংক জড়িয়ে আছে। আমি মাঝে মাঝে এখনো স্বপ্ন দেখি যে বুয়েটে পরীক্ষা দিচ্ছি, সেই পরীক্ষা ভয়াবহ খারাপ হচ্ছে, একটা প্রশ্নেরও উত্তর জানি না। এই ধরণের স্বপ্ন বহু মানুষই দেখে, স্বপ্নে কেউ ভালো পরীক্ষা দিয়েছে সেটা শুনিনি। পরীক্ষা স্বপ্নে উপস্থিত হলে সে বিভীষিকা নিয়ে হাজির হয়। তবে আমার পরীক্ষা নামক বিভীষিকার সূত্রপাত বুয়েটে নয় আরও আগে। বুয়েট সেটা অন্য মাত্রা দিয়েছে যদিও। আমি যখন স্কুলের নিচের দিকের ক্লাসে তখন একবার বাংলা পরীক্ষা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলাম। বইতে অনেকগুলো কবিতা ছিল, কিছুতেই মুখস্থ হচ্ছিল না। আব্বা স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, সাত্তার স্যার জানালেন কবিতার প্রথম আট লাইন মনে রাখতে পারলেই হবে, পরীক্ষাতে নাকি প্রথম আট লাইনই থাকবে। আমি অতি কষ্টে সব কবিতার প্রথম আট লাইন শিখলাম। 


যাই হোক পরীক্ষার দিন আমি গিয়ে দেখলাম কবিতার শেষ আট লাইন মুখস্থ লিখতে বলা হয়েছে। ক্লাস টু বা থ্রিয়ের আমি বুঝে গেলাম পরীক্ষা নামক জিনিসটার মূল উদ্দেশ্য ছাত্রছাত্রীদের বিপদে ফেলা, ব্যাপারটা আমার এখনও মনে পড়ে এবং মনে পড়লেই সাত্তার স্যারকে আমি দুটো গালি দেই। কিন্তু সেই থেকে একটা জ্ঞান লাভ হয়েছে। ব্যাপারটা হচ্ছে জীবনের পদে পদে লুকিয়ে আছে পরীক্ষা, বেশির ভাগ পরীক্ষা খাতা পত্রে হয় না। আমাদের স্কুলে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক ছিল। শহীদুর রহমান স্যার নামাজের টাইমে মসজিদের বাইরে দেখলেই ধাওয়া দিতেন। মসজিদের ভেতর মাঝে মাঝে সুরাও জিজ্ঞেস করতেন। মসজিদের ভেতর একবার আয়াতুল কুরসি জানি কিনা এই পরীক্ষাও দিতে হয়েছে। তবে মনুষ্যসৃষ্ট পরীক্ষার মধ্যে কঠিনতম পরীক্ষাগুলো দিয়েছি আমি বুয়েটে। বুয়েটের প্রতিটি পরীক্ষাতে দুটো অংশ থাকতো। প্রতি অংশে ৩টা প্রশ্নের মধ্যে দুটোর (অথবা ৪টার মধ্যে ৩টার) উত্তর করতে হতো। এর মধ্যে একটা প্রশ্ন খুব কঠিন হতো। আর বিপদ হচ্ছে বাকি প্রশ্ন গুলোও খুব সহজ না, হয়ত একটার উত্তর অর্ধেক জানি, আরেকটা ৭৫%। সবগুলো জোড়াতালি দিয়ে কোন মতে পরীক্ষা শেষ করতে হতো। পরীক্ষার আতংক আগে থাকলেও বুয়েট সেটাকে PTSD  এর লেভেলে নিতে পেরেছে। 

ছাত্রজীবন শেষেও পরীক্ষা শেষ হয় না। প্রকৌশলীদের চাকরির ইন্টারভিউ কার্যত সারাদিনব্যাপী পরীক্ষা। ৪৫ বছর বয়েসে এক কোম্পানি ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম। সকাল নয়টাতে কিছু প্রোগ্রামিং এর সমস্যা দিয়ে ইন্টারভিউ শুরু হলো। উৎরে গেলাম ভালো মতো। এর পরে দুপুর পর্যন্ত ভালোই চলছিল। ইন্টারভিউজনিত ক্ষুধাতে কাতর হয়ে বেশি খাওয়ার ফলে লাঞ্চের পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মতো ব্যাটিং বিপর্যয় শুরু হল। ঘুম ঘুম চোখে কিছুতেই মাথা কাজ করে না। সহজ ও কঠিন দুই ধরণের প্রশ্নতেই উইকেট ভেঙ্গে পড়তে লাগলো তাসের ঘরের মতো। বিধ্বস্ত হয়ে বিকেল পাঁচটাতে ছাড়া পেলাম। এই অবস্থাতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে সংবাদ সম্মেলন করতে হয় এইটা ভেবে টাইগারদের জন্য কষ্ট লাগলো।

পরীক্ষা নিয়ে পরে অনেক ভেবেছি। পরীক্ষা ব্যাপারটা সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্টের অন্য এক নাম। প্রকৃতি আসলে সবচেয়ে বড় পরীক্ষক। দুর্বল, অসহায় এদের কোন স্থান নেই প্রকৃতিতে। এদের বিলুপ্ত হয়ে যেতে হয়। আমি চোখের সামনে আহত সাপের ছানাকে পাখির খাবার হতে দেখেছি। স্কুল, কলেজ অথবা ভার্সিটির মাস্টারেরা অনেক সময় সহৃদয় হয়ে পাশ করালেও প্রকৃতি দুর্বলকে দয়া করে না। ইউরোপের অনেক দেশেই নাকি বাচ্চাদের নিচের দিকের ক্লাসে কোন পরীক্ষা দিতে হয় না। আমেরিকাতেও নিচের ক্লাসগুলোতে পরীক্ষা নামকাওয়াস্তেই হয়। কিন্তু মানুষকে একটা সময়ে পরীক্ষা দিতেই হয়, ক্লাসে, চাকরিতে, ক্লাসের বাইরে, বাসে ওঠা থেকে শুরু করে ভিসার এপ্লিকেশন - সর্বত্রই নানান মোড়কে পরীক্ষা উপস্থিত। জন্ম নিলেই পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষা মৃত্যুর মতোই এক অবধারিত সত্য। 

প্রতি বছর অফিসে নানান কোর্স নিতে হয়। আমার জীবন স্পাই থ্রিলারের মতো, আমি সব কিছু শেষ মিনিটে সমাধান করার চেষ্টা করি। সুতরাং ডিসেম্বর মাসে কোর্সের ঝাঁপি খুলে বসেছি। জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন  - পৃথিবীতে নাই কোন বিশুদ্ধ চাকুরি। ভদ্রলোক সম্ভবত আমার মতোই অর্থপোর্জনের জন্য কাজ করতেন, আনন্দের জন্য না। তিনি আরও বলেছেন - 

“আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই বহন করে করুক; আমি প্রয়োজন বোধ করি না :
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।”

জীবনানন্দ পাঠ নানান দিক থেকেই প্রশান্তিময়। "নট জাস্ট মি" টাইপের একটা ফিলিং তো হয় তবে সেই সঙ্গে একটা জিনিস টের পাওয়া যায় জীবনের পরীক্ষাতে পাশ করতে গেলে প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন তার সানডে মানডে ক্লোজ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করতে হবে, নইলে গভীরভাবে অচল হওয়ার চান্স আছে। সেই জন্য দরকার সাহস এবং সাহস, বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। 

লাস্ট কোর্সটা করছি। গোটা কয়েক পরীক্ষা বাকি আছে। 

দোয়াই কাম্য। 

###

Wednesday, September 1, 2021

পাখি হয়ে যায় প্রাণ

গতকাল বিকালে পার্কে হাঁটছিলাম। দুটো মেয়ে আমাকে থামালো। ওদের চেহারা আর বেশভূষা দেখে বোঝা যাচ্ছিল চার্চের কাজে বেরিয়েছে। বহুদিন এই দেশে থাকার কারণে কয়েক সেকেন্ডে বুঝে ফেলতে পারি কে বাড়ির ছাদ সারানোর সার্ভিস বিক্রি করবে আর কে প্রভু যীশুকে বিক্রি করবে।

মেয়ে দুটোর বয়েস খুবই কম। ইতস্ততঃ বোধ করছিল। যীশুর বাণী প্রচারে অত পোক্ত হয় নি। আমাকে থামিয়ে বলল, একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারবে কিনা। আমি রেডি হচ্ছিলাম সময় নাই বলার। কিন্তু সেটা বললাম না শেষ পর্যন্ত।

প্রশ্নটা ছিল - আজকে কোন জিনিসটা আমাকে খুশি করেছে? (What made you happy today?)

আমি নিশ্চিত ছিলাম এর সূত্র ধরে পরের আলোচনাতে যাবে এরা। কিন্তু এই প্রশ্নটা নিয়ে আমি ভাবা শুরু করলাম। সত্যিকার অর্থে খুশি হওয়ার মতো কিছু হয় নি। আমাদের বিড়াল লরেল অসুস্থ, সে চোখে দেখতে পাচ্ছে না। আফগানিস্তান থেকে মার্কিনেরা বিদায় নেওয়ার পরে সেখানে ভয়ানক অবস্থা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় এসে হানা দিয়েছে, হু হু করে বাড়ছে কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা, অফিসের কাজের জটিলতা চলমান - ঠান্ডা মাথাতে চিন্তা করে দেখলে খুশি হওয়ার কোন কারণ প্রত্যেক দিন ঘটে না, কদাচিৎ আনন্দ এসে দেখা দিতে পারে। তার দেখা পাওয়া ইদানিং দুষ্কর হয়ে গেছে বিশেষত খবরের কাগজ পড়ার পরে।

আমি আকাশ পাতাল চিন্তা করতে লাগলাম। এই এক লাইনের প্রশ্ন যে বুয়েটে পড়া থার্মডিনামিক্সের পরীক্ষার মতো কঠিন হয়ে যাবে কে জানতো?

আমি শেষ পর্যন্ত জানালাম - আমি যে বেঁচে আছি এইটাই আমার কাছে আপাতত সবচেয়ে আনন্দের খবর। জবাবটা আমি সত্যি সত্যি মন থেকে দিয়েছি।

এর জবাবে ওরা আর কথা বাড়ালো না। বলল - এভ্রি ডে ইজ এ গিফট, তাই না, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। ঈশ্বর অবশ্য আমার অনেক মঙ্গলই করেছেন। ব্যক্তিগত পরিমন্ডলে আমি কোন বিশাল সমস্যাতে নেই। তিনি এখন অন্যান্য কাজে হাত দিতে পারেন।

কিন্তু এভ্রিডে যে গিফট সেটা আজকে সকালে মনে হলো। সকালে ঘুম ভেংগেছে দেরিতে। অফিস শুরু না করে ধীরে সুস্থে চা বানালাম। এরপরে লরেলকে নিয়ে বাইরে গেলাম। গরম সহনীয়, হালকা বাতাস ছিল, সামান্য ফুলের মৌতাতও ছিল। চায়ে চিনি পরিমিত হয়েছে, মাথার উপরের আকাশটাও গাঢ় নীল, ছেলেবেলার মতো, প্রায় দুঃখহীন। আমাদের নিজেদের তৈরি করা এক চিলতে প্রকৃতিতে বসে রইলাম চুপচাপ। নেচার হ্যাজ অল দ্য আনসারস - এক ন্যাশানাল পার্কে এই আপ্তবাক্যটা পেয়েছিলাম। কথাটা খাঁটি।

কিন্তু প্রকৃতি ছাড়া আর যাবতীয় জিনিস পীড়াদায়ক। এর মধ্যে এক নম্বরে আছে অফিস, দুই নম্বরে আছে দিন দুনিয়ার খবর - এই দুই ইয়ে মিলে পুরোদিনের সুখ, আনন্দ সবই বরবাদ করে দিতে পারে। সামারা যখন ছোট ছিল তখন জিজ্ঞেস করতো মানুষকেই কেন একমাত্র স্কুল আর অফিসে যেতে হয়? অন্য কোন প্রাণীকে এই যন্ত্রণা নিতে হয় না। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। প্রাণীজগতের সবচেয়ে বুদ্ধিমান হওয়ার পরেও আমরা নিঃসঙ্গ, নিজেদের তৈরি করা বাজারের ফাঁদে নিজেরাই আটকে গেছি। এই কোলাহলে আর নিজের ভেতরের মানুষটার দেখাই মিলে না একদম।

প্রশ্নটা আজকে করা হলে জবাব দিতে দেরি হতো না। এই সফেদ সকালটা অনেকখানি ভার নিয়ে গেছে, জটিলতা থেকে ২০ ফুট দূরে (মানে আমার কাজের ও অকাজের ল্যাপটপ আরকি) বসেও প্রায় মহামুক্তি পেয়ে গিয়েছিলাম। পাখির পালকের মতো হালকা এই সকালে আবারও টের পেয়ে গেলাম যে অবশেষে মানুষ আসলে একা, একদম একা!

"অবশেষে জেনেছি মানুষ একা!
জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!
দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনোদিন।

ফাতিমা ফুফুর প্রভাতকালীন কোরানের
মর্মায়িত গানের স্মরণে তাই কেন যেন আমি
চলে যাই আজও সেই বর্নির বাওড়ের বৈকালিক ভ্রমণের পথে,
যেখানে নদীর ভরা কান্না শোনা যেত মাঝে মাঝে
জনপদবালাদের স্ফুরিত সিনানের অন্তর্লীন শব্দে মেদুর!

মনে পড়ে সরজু দিদির কপালের লক্ষ্মী চাঁদ তারা
নরম যুঁইয়ের গন্ধ মেলার মতো চোখের মাথুর ভাষা আর
হরিকীর্তনের নদীভূত বোল!
বড় ভাই আসতেন মাঝরাতে মহকুমা শহরের যাত্রাগান শুনে,
সাইকেল বেজে উঠত ফেলে আসা শব্দে যখন,
নিদ্রার নেশায় উবু হয়ে শুনতাম, যেন শব্দে কান পেতে রেখে :
কেউ বলে যাচ্ছে যেন,
বাবলু তোমার নীল চোখের ভিতর এক সামুদ্রিক ঝড় কেন?
পিঠে অই সারসের মতো কী বেঁধে রেখেছ?

আসতেন পাখি শিকারের সূক্ষ্ম চোখ নিয়ে দুলাভাই!
ছোটবোন ঘরে বসে কেন যেন তখন কেমন
পানের পাতার মতো নমনীয় হতো ক্রমে ক্রমে!

আর অন্ধ লোকটাও সন্ধ্যায়, পাখিহীন দৃশ্য চোখে ভরে!
দিঘিতে ভাসত ঘনমেঘ, জল নিতে এসে
মেঘ হয়ে যেত লীলা বৌদি সেই গোধূলিবেলায়,
পাতা ঝরবার মতো শব্দ হতো জলে, ভাবতুম
এমন দিনে কি ওরে বলা যায়—?

স্মরণপ্রদেশ থেকে এক একটি নিবাস উঠে গেছে
সরজু দিদিরা ঐ বাংলায়, বড়ভাই নিরুদ্দিষ্ট,
সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি সাথে করে নিয়ে গেছে গাঁয়ের হালট!
একে একে নদীর ধারার মতো তারা বহুদূরে গত!
বদলপ্রয়াসী এই জীবনের জোয়ারে কেবল অন্তঃশীল একটি দ্বীপের মতো
সবার গোচরহীন আছি আজও সুদূরসন্ধানী!

দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি,
সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতন একা একজন লোক,
যাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে কেবলি
শতজীবনের শত কুহেলি ও কুয়াশার গান!

পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলি মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!"

(পাখি হয়ে যায় প্রাণ - আবুল হাসান)

Tuesday, August 31, 2021

যীশু

প্রায়দিনই দরজার সামনে যীশুর আহবান রাখা থাকে। উনি সব সময়েই ইহকাল এবং পরকালের উন্নতি আর আলোর পথে আসার নানান সার্ভিস অফার করেন। ধর্মের সাথে বাজার ব্যবস্থা সম্পর্ক অনেক পুরানো। যীশুর সার্ভিস নিতে গেলেও পকেটের পয়সা খরচ হবে দেখে কোন দিন তার ডাকে সাড়া দেই নি। আজকে একটু ব্যতিক্রম দেখলাম। আজকে দরজার সামনের ফ্লায়ারে জেসাস গাছ কাটার জন্য ১৫% ছাড় দিয়েছেন। সত্যি কথা বলতে যীশুর অন্য কোন বাণীতে আমি এতোটা আপ্লুত হইনি। এইবার সত্যি সত্যি ওনাকে ফোন দিতে পারি। ইহকাল আর পরকাল ঠিক করার বহু বহু ব্যবস্থা থাকলে কম খরচে গাছ কাটার লোক পাওয়া কঠিন।


যীশু প্রসঙ্গে মনে পড়ল - বহুদিন আগে আমরা ৩ বন্ধু একই বাসায় থাকতাম। এর মধ্যে রুমি ছিল ধার্মিক। প্রায়ই রাতে সে ব্লকব্লাস্টার থেকে ধর্মীয় সিনেমা নিয়ে আসতো। নবী রসুলদের জীবনী নিয়ে করা। ইসলাম ধর্ম আর খৃষ্ট ধর্মের নবী রসুল প্রায় একই। সুতরাং মার্কিনি ধর্মীয় সিনেমা কার্যত আমাদের ধার্মিকদের জন্যেও প্রযোজ্য।

রাতে বাসায় ফিরে পানীয় পান করতে করতে আমরা রুমিকে জিজ্ঞেস করতাম - আজকে কোন নবী দোস্ত?

একদিন ইউসুফ নবীর সিনেমা দেখলাম। কাহিনি আমরা যা পড়েছি ঠিক সেই রকমই। সিনেমার শেষে ধর্মীয় গুরুগম্ভীর আলোচনাও হত। নিজে পান না করলেও আমাদের পানীয়তে রুমি বাঁধা দিতো না কদাচও।

রুমির কাছে শুনেছিলাম যে যীশু নাকি আবার ফিরে আসবেন। অস্থির এই পৃথিবীতে শান্তি আনার জন্য তিনি ফিরবেন সিরিয়াতে - দামেস্ক শহরে। ১৫ বছর আগে সিরিয়াতে যুদ্ধ শুরু হয় নি। মার্কিন দেশ মধ্যপ্রাচ্যের বারোটা বাজানোর জন্য ইরাক আর আফগানিস্তানে যুদ্ধ করছে। ইংরেজিতে যেটাকে বলে গাং-হো - জাতীয়তাবাদ ঠিক সেই পর্যায়ে আছে। ফ্রান্স আর জার্মানি ইরাক যুদ্ধের বিরোধীতা করাতে কংগ্রেস ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজের নাম পালটিয়ে ফ্রিডম ফ্রাইজ করে দিয়েছে। ফরাসী চুম্বন (ফ্রেঞ্চ কিস) বিষয়ে অবশ্য কবি নীরব। সেটার নাম পালটায় ফ্রিডম কিস করা হয় নাই। জাতীয়তাবাদের চেয়ে বিপদজ্জনক অসুখ এই পৃথিবীতে আর দু'টি নেই।

সিরিয়াতে যীশু ফিরবেন শুনে আমার একটু দুঃখ লাগলো। আমি রুমিকে বললাম - যীশুকে তো মার্কিন দেশ ভিসা দিতে চাবে না। যীশু দেখতেও মধ্যপ্রাচ্যীয় হবেন (আসল যীশুও তা-ই ছিলেন), তার কপালে বহু খারাপি আছে। সকাল বিকালে যীশুর নাম জপা লোকজনও তাকে সন্ত্রাসী বলে ডাকবে। তাছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যসহ বাকি পৃথিবীতে শান্তি আনতে গেলে তো গণতন্ত্র আর শান্তির সোল এজেন্ট মার্কিনিরা ক্ষেপে যাবে।

প্রশ্নটা অমীমাংসিত রেখেই সেই আলোচনা বন্ধ করতে হয়েছে।

১৬ বছর পরে এখনো আমি মাঝে মাঝে যীশুর পুনর্জন্ম নিয়ে ভাবি। সিরিয়ার অবস্থা আরো টাইট। এখন ওখানে ফিরলে তাকে শরনার্থী হয়ে ইউরোপেও যেতে হতে পারে। সেখানে অনেক যীশুভক্তের লাথি আর গুঁতো অপেক্ষা করছে তার জন্য। ঈশা নাম নিয়ে তিনি নানাবিধ সমস্যাতে থাকবেন। তার পুর্নজন্ম পূর্বের জন্মের চেয়ে সুখের হবে না। আর এই ফ্লায়ারটা যেই যীশু রেখেছে (মেক্সিকান কোম্পানি, এই সব সার্ভিস ওরাই দেয় মূলত - Jesus এর উচ্চারণ হওয়া উচিত হিসুস) সেই জেসাসরাও কম ঝক্কি পোহাচ্ছে না এই দেশে ঢুকতে। Jesus নাম মেক্সিকোতে বেশ পপুলার। আমরা যেমন মোহাম্মদ রাখি নামের সামনে। মার্কিনিরা যীশুকে ডাকলেও যীশুর নামের মানুষ খুব বেশি দেখি নি।

আমার কৃতকর্মের জন্য ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করে দিলেও দিতে পারেন। কিন্তু আমার উঠোনের বেয়াড়া হয়ে ওঠা গাছ উনি কাটবেন না এটা নিশ্চিত বলা যায়। অচিরেই গাছকর্তক যীশুকে ফোন দেব। নইলে দেখা যাবে এই যীশুও পলাতক। 





Thursday, August 26, 2021

পথচলা

আনুশা স্কুল অপছন্দ করতো। শিক্ষাজীবনের প্রথম দিকে আনুশা হারমনি স্কুলে যেত। হারমনি স্কুলের অনেক সুনাম। কিন্তু আনুশার পছন্দ হয় নি। নিয়ম কানুন খুব কড়া, স্কুলের একটা ড্রেস আছে। খেলার জায়গা সীমিত। আনুশার লেজে লেজে সামারারও লেখাপড়ার শুরু একই স্কুলে। বোনের মতো তারও স্কুল অপছন্দ।


একদিন আমি হারমনি স্কুলের পার্কিং লট গাড়ি পার্ক করছি, ওদের অফিসে কি একটা কাজ আছে। স্কুলের মাঠ থেকে আনুশা আমাকে দেখতে পেল। সে দৌড়ে ছুটে এলো, বেড়ার ভেতর দিয়ে ছোট হাতটা দিয়ে আমার আঙ্গুল ধরল। আমাকে দেখে আনুশা খুশি, ও ভেবেছে আমি ওকে বাসায় নিয়ে যাবো। আনুশার মন খারাপ ছিল, একদম পাশে দাঁড়িয়ে আছে টার্কিশ মেয়ে মেরিয়াম, আনুশার হারমনি জীবনের সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। আনুশার মন খারাপ হলে সে আনুশাকে স্বান্তনা দেওয়ার কাজটা করত। সেইদিন আমি আনুশা স্কুল থেকে বাসায় নিতে আসি নি। মন খারাপ অবস্থাতে মেয়েটাকে রেখে এসেছিলাম।

এর কিছুদিন পরে স্কুলের অফিস থেকে আনুশার ফোন। ওকে বলা ছিল স্কুলে যদি কোন অসুবিধে হয় তাহলে যেন আমাকে ফোন দেয়। আনুশার মন খারাপ লাগছিলো, সে বাসাতে যেতে চায়। আমি এইবার আর ভুল করলাম না। ওকে দ্রুত বাসাতে নিয়ে গেলাম। সেই সঙ্গে ঠিক করলাম, হারমনি স্কুল আর না। স্কুলের উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন, কিন্তু সেটা একমাত্র উদ্দেশ্য না। হারমনি স্কুল ছেড়ে আনুশা আর সামারা দুইজনই আবার পাব্লিক স্কুলে ফেরত এলো। দুই বোনই বিস্তর খুশি হয়েছিল।

আমি সারাজীবন পাব্লিক স্কুল, কলেজ আর ভার্সিটিতে পড়েছি। যেই পৃথিবীতে আমরা বাস করি, সেই পৃথিবীর ছোটখাটো স্যাম্পল দেখতে হলে পাব্লিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই সবচেয়ে ভালো। পাব্লিক স্কুলে ফেরার পরে আনুশা আর কোন দিন ফোন করেনি, আমাকে স্কুলে দেখার পরেও বাড়ি ফিরতে চায় নি। দুই বোনই এরপরে স্কুলকে পছন্দ করা শুরু করেছে। আনুশা এলিমেন্টারি স্কুল শেষ করেছে, মিডল স্কুল শেষ করেছে, এই গত সপ্তাহে হাই স্কুলের প্রথম ক্লাস, যেটাকে ফ্রেশম্যান ইয়ার বলে, সেটাও শেষ করল। সামারা এলিমেন্টারি স্কুল শেষ করেছে, মিডল স্কুলের সপ্তম শ্রেণী শেষ করল। আর তিনমাস পরে ক্লাস টেন আর এইট শুরু হবে দুই বোনের।

অন্য সব কাজের মতো শিক্ষাটাও আনন্দময় পরিবেশে হলে সেটার ফলাফল ভালো হতে বাধ্য। আমার ক্ষেত্রে এটা সত্য, আমার মেয়েদের জন্যও সত্য। আনুশা আর সামারা দুইজনেই খুব ভালো ফলাফল করেছে, আনন্দ নিয়ে স্কুলে গেছে, ঝুড়ি ঝুড়ি এওয়ার্ড পেয়েছে, ন্যাশানাল অনার সোসাইটিতে যোগ দিতে পেরেছে। হাইস্কুলে আনুশা এডভান্সড কোর্স নিয়েছে, মধ্যরাত পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে এবং তার ফলাফলও পেয়েছে। এরপরেও স্কুলে যাওয়া কোনদিন নিরানন্দময় মনে হয় নি।

গত মার্চ মাসের ১২ তারিখের পর আর স্কুল যেতে হয় নি - তিন সপ্তাহ ছুটির পরে ডিস্ট্যান্ট লার্নিং শুরু হয়েছে স্কুলগুলোতে। সেখানেও বেশ চাপের মধ্যেই ছিল দুই বোন। যেই মেয়েরা স্কুল যেতে চাইতো না, তারাই এই দীর্ঘ বন্ধে স্কুলকে মিস করছে, মনে প্রাণে চাইছে যেন স্কুল খুলে যাক। আমরাও তাই চাইছি। আবারও আমি টের পাচ্ছি যে স্কুল শুধু পড়ালেখার জায়গা না। এতো বছর পরে আমি যখন আমি আমার স্কুলের কথা ভাবি তখন আমার বন্ধুদের কথা মনে হয়, মনে হয় স্কুলের বিশাল মাঠটার কথা - লেখাপড়ার কথা আমার মনেই পড়ে না। স্কুলের কথা মনে হলেই আমার মনে হয় এক অবাধ ছুটির সময়।

আমার দুটো মেয়ে আরও একটি ধাপ পেরিয়ে গেল। সব ঠিক থাকলে আনুশার স্কুলের পাঠ চুকে যাবে তিন বছর পরে, সামারার আর পাঁচ বছর। আমি চাই ওরা ওদের স্কুলের সময়টা আনন্দে শেষ করুক – সকালের বাস ধরে ঘুম ঘুম চোখে স্কুলে যাক, সারাদিন ক্লাস শেষে ঘরে ফিরুক ক্লান্ত হয়ে, এরই মাঝে চলুক বন্ধুদের সাথে আড্ডা, গল্প আর হই হুল্লোড়।

আমরা সবাই যে সুখে ছিলাম সেটা এই অসুখের সময়ে আরও বেশি বেশি বুঝতে পারছি। আশাকরি এই দুঃসময়ের অবসান হবে, আনুশা সামারাসহ এই পৃথিবী লক্ষ লক্ষ শিশু কিশোর ফিরতে পারবে স্কুলে। সবার পথাচলা হোক বাধাঁহীন।







Thursday, August 19, 2021

সুখী নীলগঞ্জ

মতিউল্লাহ স্যারকে সবাই ভয় পেত। কাঁচা পাকা চুল, ভারী চশমা, রাশভরী মানুষ। অংক করাতেন। একটু চিবিয়ে কথা বলতেন, আর কথাতে একটু চন্দ্রবিন্দুর প্রভাব থাকতো। এক সময়ে স্কুলের টেরর স্যার ছিলেন। সব গরম জিনিসই ঠান্ডা হয়ে যায় এক সময়ে। আমরা যখন স্যারের ক্লাস করি তখন স্যার অনেকটাই ঠাণ্ডা। একদিন ক্লাসে উনি ছয় ইঞ্চি একটি রেখাকে দুই ভাগ করতে দিলেন। আমি দ্রুত স্কেল বের করে ছয় ইঞ্চি রেখা টানলাম, মাঝের পয়েন্টটা মার্ক করে স্যারের কাছে নিয়ে গেলাম। সমস্যাটা আসলে স্কেল দিয়ে মেপে দুই ভাগ করার জন্য না, এরচেয়ে অনেক জটিল।
স্যার আমার কাজ দেখে হুংকার দিলেন। "এইঁ অংঁক কোঁথায় শিঁখেছো? ঘোঁড়ার ঘাঁসটাও কাটতে পারবা না। স্কুঁল পাঁশ করে সিঁটি কঁলেজের নাঁইট সেঁকশনে ভর্তি হতে হবে।"
স্যারের মতে অধঃপতনের দুটো ধাপ আছে। প্রথমটা ঘোড়ার ঘাস কাটা আর শেষ পর্যন্ত ভালো কোন কলেজে চান্স না পেয়ে সিটি কলেজের নাইট সেকশনে ভর্তি হওয়া। আমি নিজের বাসার ঘাস একবার কাটতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম ঘাস কর্তন সহজ কাজ না। সিটি কলেজও কালক্রমে খুব ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়েছে। দুটোই আদতে ফেলা দেওয়ার মতো কাজ না।
ধমক খেয়ে আমি ম্রিয়মান হয়ে গেলাম। স্যার অবশ্য মারধোরের দিকে গেলেন না। ক্লাসে মূলত মার খেতো টুলু। স্যারের কনিষ্ঠ পুত্র। আমাদেরই বাল্যবন্ধু। অংক শেখানোর জন্য টুলুর উপর স্ট্যান্ডিং অর্ডার ছিল যে সে যেন তার ক্লাসের প্রতিটি প্রাইভেট ব্যাচের সাথে অংক শেখার জন্য বসে। কিন্তু অংক জটিল জিনিস। প্যাঁচ লেগে যায়। দুর্গে ৫০ জন সৈন্যের খাবারে ৭০ জনের কতদিন চলবে এই জটিলতা অথৈ জলে ফেলে দেয়। এই অংক মনে হয় আফগানিস্তানে লাগতে পারে। ভীষণ গোলযোগের ভেতর ওদের ঐকিক নিয়ম করতে হয় ওদের।
যাই হোক পরীক্ষাতে একবার একটু ইয়ে হয়ে গেল টুলুর। অবস্থা বেগতিক দেখে সে এক সকালে গৃহত্যাগ করলো। টিভিতে হুমায়ূন আহমেদের "এইসব দিনরাত্রি" প্রবল জনপ্রিয়। সেই নাটকের এক চরিত্র কবির মামা তাঁর গ্রামকে আদর্শ বানাবেন। সেখানে দুঃখ থাকবে না, অনাচার থাকবে, মানুষের মধ্যে থাকবে সমতা আর বন্ধুত্ব। সেই গ্রামের নাম দিয়েছেন উনি সুখী নীলগঞ্জ। পরীক্ষাতে একটু ইয়ে হয়ে গেলে সুখী নীলগঞ্জ এক অবশ্য গন্তব্য।
তবে গৃহত্যাগের পরে দ্রুতই টুলু ফিরে এলো। অল্প সময়ে সে আবিষ্কার করে ফেলল যে এই দুনিয়ার কোথাও সুখী নীলগঞ্জ নেই, নীললোহিতের দিকশূন্যপূরের মতো সে অস্তিত্বহীন। দুনিয়া জোড়া আছে দুঃখী নীলগঞ্জ। বঞ্চনা, অনাচার, অসাম্য আর কষ্ট সর্বত্রই, পালিয়ে কোন লাভ নেই।
টুলু অবশ্য সরাসরি বাসায় ফিরে নি। সে ঢুকে গেলে সকাল বেলার ছাত্রদের ব্যাচে। হঠাৎই স্যারের নজরে এলো।
আঁরে টুঁলু সাহেব যে? একটু বিরতি দিয়ে - আঁরো এক ঘঁড়া মাঁর্বেল কিঁনে দেঁই?
এরপরে কী হয়েছিল আমার জানা নেই। কিন্তু আন্দাজ করতে পারি।
একদিন আমরা সবিস্ময়ে টের পাই আমরাও বড় হয়ে গেছি। পালানোর সব পথই বন্ধ। কিন্তু ঘর পালানো কাউকে দেখলে আমার বালকবেলার কথা মনে হয়। কয়েক বছর আগে পত্রিকাতে দেখেছিলাম কয়েকজন কিশোর ঘর থেকে পালিয়ে বঙ্গোপসাগরের দ্বীপে যাওয়ার প্ল্যান করার সময়ে ধরা পড়েছে। আমরা বুড়ো হয়ে গেলে কোথাও না কোথাও শৈশব আর কৈশোর বেঁচে আছে। কেউ না কেউ স্বপ্ন দেখছে।
স্বপ্ন আমিও দেখি। অনেক দূরের ফেলা আসা দিনের স্বপ্ন। ওরা একদম তাজা বাতাস দিয়ে আসে, এজমার টান ভুলে যাই, ভুলে যাই অদ্ভুত এই বাস্তবতাকে। টের পাই অনেক দূরের কোন এক সুখী নীলগঞ্জ এখনও বেঁচে আছে, এখনও তাকে স্পর্শ করা যায়, এমনকি চাইলে ঘুরেও আসা যায়। এই অস্থির সময়ে দূর থেকে দেখা সেই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। স্বপ্ন দেখায়, কানে কানে বলে - শোন কালকের দিনটা কিন্তু অনেক ভালো হবে।
সেই আশা নিয়ে এখনও বেঁচে আছি।

Friday, July 30, 2021

বাঁটু করিম

আনওয়ারুল করিম নামে আমাদের এক স্যার ছিলেন। অংকের স্যার। আমরা যখন থ্রিতে পড়ি তখন স্যার ল্যাবরেটরি স্কুলে এলেন। আমাদের ক্লাসের শ্রেণী শিক্ষক। অতি দ্রুতই স্যারের নাম হয়ে গেল বাঁটু করিম, আমাদের বা আমাদের আশেপাশের ব্যাচেরই দেওয়া নাম। বাঁটু নামটার শানে নযুল ব্যাখ্যার দরকার নেই।


কিছুদিন পরে বাঁটু করিম নামটা সংক্ষিপ্ত করে দেওয়া হলো। হয়ে গেল বিকে। মাঝে মাঝে টাইটেল আসল নামকে ছাড়িয়ে যায়। বিকের ব্যাপারে তাই হলো। বিকে নামটা ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে গেল। সবাই তাঁকে বিকে স্যার হিসাবে জানে, জন্মসূত্রে "একে" কর্মসূত্রে হয়ে গেলেন "বিকে"।

আমার এবং আমাদের বন্ধুদের স্কুল জীবনটার একটা অংশ কেটেছে বিকের আতংকে। ক্লাস থ্রি, ফাইভ, সেভেন, নাইন, টেন - প্রতি শ্রেণীতে তিনি অংক শিক্ষক। যোগ বিয়োগ দিয়ে শুরু করে - ভগ্নাংশ, শতকরা, উৎপাদকে বিশ্লেষণ, ত্রিকোনমিতি, ঘন জ্যামিতি - সবর্ত্রই বিকে। পাঞ্জাবি, পায়জামা পরা সাদামাটা অংকের যাদুকর। এর হাত থেকে পালানোর উপায় নেই। নিউমার্কেটে স্যারের কাপড়ের দোকান আছে (নামটা মনে আছে - টপ ইন দ্য টাউন), ওখানে সন্ধ্যার পরে ঘোরাঘুরি করতে গেলে স্যারের নজরে আসার সম্ভবনা আছে - যেটার ফলাফল হবে পরদিন অংক ক্লাসে নাজেহাল।

নাজেহালের বর্ণনা দেওয়া যায়। স্যার নিজের ডাস্টার আনতেন, সেই সাথে স্কুলের পিকনিকের সময় মধুপর থেকে আনা ডোরাকাটা সাদা বাদামী বেত আসতো কখনো কখনো। বিকে প্রায় প্রতি ক্লাসে বোর্ডে অংক করতে পাঠাতেন। প্রায় সব ছাত্রের নাম ও রোল নম্বর জানা ছিল স্যারের - সেই সঙ্গে কে কেমন অংক জানতো সেটাও বিলক্ষণ জানতেন। স্যারের ভাষাতে যারা "দুর্বল সেন" তাদেরকে বোর্ডে পাঠানো হতো অঙ্ক করার জন্য।

যারা জানেনা তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি - স্কুলের বোর্ডে অংক ঠিকঠাক মতো করা পৃথিবীর পাঁচটা জটিল কাজের একটা। অংকে ভুল করা ছাত্রদের লাইনে দাঁড়া করানো হতো। সেই কঠিন জালে ভালো ছাত্রেরাও আটকা পড়ত প্রায়ই, কেননা বোর্ডের সামনে দাঁড়ালেই যাবতীয় জ্ঞান মাথা থেকে দূর হয়ে যায়।

যাই হোক মোটামুটি সংখ্যক ছাত্র জমা হলে স্যার বলতেন এই বার এরা খেলা দেখাবেন। এরপরে স্যার যত্ন করে নিজের হাতের ঘড়িটা খুলে টেবিলে রাখতেন, আস্তে আস্তে পাঞ্জাবির আস্তিন গুটাতেন...এরপর খেলা শুরু হতো। খেলাটা হচ্ছে ডাস্টার দিয়ে পিঠের মধ্যে দমাদম বাড়ি, অথবা বেত দিয়ে সপাং সপাং বাড়ি। প্রায়ই দেখা যেত বেত ভেঙ্গে গেছে। সেই বেত ভেঙ্গে গেলেও স্যার দমতেন না, অফিস রুম থেকে আরেকটা আনা হতো। স্যার এমনকি স্কুলের গাছের ডাল ভেঙ্গেও ছাত্রদের "পৃষ্ঠপোষকতা" করেছেন। একবার আমাদের বন্ধু জাকিরকে অন্ধের মতো পিটাতে পিটাতে ঘন্টা পড়ে গিয়েছিল, স্যার বিদায় নেবার সময়ে জানালেন সিক্সথ পিরিয়ডে এসে আবার জাকিরকে মারবেন। ক্লাসের প্রতিটি ছেলে মার খেয়েছে এমন ঘটনাও বিরল না। স্যার কৌতুক করে বলতেন যে - এমন জায়গাতে উনি মারবেন যে বাসাতে গিয়ে কেউ অভিভাবককে প্যান্ট খুলে দেখাতে পারবে না।

বাটু করিমের অংক বোঝানোর স্টাইলটা অবশ্য চমৎকার ছিল। সত্যিকথা বলতে এতো ভালো অংকের শিক্ষক আমি এই জীবনে আর দ্বিতীয়টি পাইনি। কিন্তু একই সঙ্গে বলতে হচ্ছে স্কুল জীবনে দেখা উল্লেখযোগ্য ধরণের সাইকো হচ্ছেন বাঁটু করিম। এমনও দিন গেছে যে আমি সকালে যে অংকটা বাসা থেকে করে এসেছি, সেটা বোর্ডে গিয়ে পারিনি। বহুরাতে দুঃস্বপ্ন দেখেছি, বহু রাতে দোয়া দরূদ পড়েছি যেন স্যার পরদিন স্কুলে না আসেন অথবা অকস্মাৎ ভূমিকম্পে যেন স্কুলের বিল্ডিংটা ধ্বসে পড়ে।

বলা বাহুল্য যে সেই সব দোয়া কবুল হয় নি। আমাদের এই স্টিম রোলারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। বহু কষ্ট করে আমিও শেষ পর্যন্ত অংক শিখেছি - সত্যি কথা বলতে স্কুল জীবনের পরে যেসব অংক শিখেছিলাম সেগুলো সব মাথা থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে - শুধু রয়ে গিয়েছে ক্লাস টেনের পাটিগণিত আর সেই সঙ্গে রয়ে গেছে কালান্তক বাঁটু করিম। মেয়ের অংকে সাহায্য করতে গিয়ে আটকে গেলে এখন আমার মনে হয় ডাস্টার হাতে আড়ালে কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন স্যার।

ঈশ্বর আমাদের অবশ্য একটা করুণা করেছেন। বাঁটু করিম নামটা পার্মানেট হয়ে গেছে - আমরা পাশ করে আসার ত্রিশ বছর পরেও স্যারকে এই নামেই ডাকতে শুনেছি সবাইকে। মনে হয় আমাদের তরফ থেকে এইটুকু প্রতিশোধটা রয়ে গেল। খ্যাতি বাড়তে বাড়তে তিনি হয়ে গেলেন প্রবাদতুল্য অংকের শিক্ষক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সবাই তাঁকে এই নামেই চিনে। অভিভাবকেরা স্যারের বাসাতে কলিং বেল চাপ দিয়ে খুব বিনীতস্বরে জিজ্ঞেস করেন - বিকে স্যার বাসায় আছেন? শুনেছি স্যার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন - কিন্তু অভিভাবককে তো আর ডাস্টার দিয়ে পিটানো যায় না!

কেমন আছেন স্যার? উনি বেঁচে আছেন কিনা জানি না, আমি ওনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি যেন এক সকালে কড়া নেড়ে জিজ্ঞেস করতে পারি - বিকে স্যার কেমন আছেন?

###

Friday, July 23, 2021

শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ

 সিএনএনে এক পাকিস্তানি জেনারেলের সাক্ষাৎকার শুনেছিলাম। বিন লাদেনকে মারার পরপর। সেই লোক অভিযোগ করলেন যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ফাঁসানো (ফ্রেম) হয়েছে - বিন লাদেনকে নাকি মার্কিন দেশ অনেক আগেই হত্যা করেছিল, শুধু পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর বদনাম করার জন্য এই অভিযান করে বিন লাদেনকে হত্যার নাটক করা হয়েছে।

আমার কর্মক্ষেত্রেও কিছু পাকিস্তানি সহকর্মী আছেন। উনারা মাঝে মাঝে বলেন যে পাকিস্তানের অবস্থা নাকি খুবই ভালো - এই সব তালেবানি হামলা-টামলা সব মিডিয়ার সৃষ্টি। পাকিস্তান দ্রুত উন্নতির পথে। দুর্ভাগ্যক্রমে এই রকম এক আলাপচারিতার এক সপ্তাহের মধ্যে পাকিস্তানের এক স্কুলে হামলা করে অনেক অনেক বাচ্চাকে মেরে ফেলল তালেবানরা। আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করি নি - করলে অনেক ইঙ্গ-মার্কিন বহুজাতিক ষড়যন্ত্রের গল্প শোনা যেত।
পাকিস্তানি সম্বন্ধে আমার দুটি অবজার্ভেশন আছে। প্রথমটা হচ্ছে যে কোন ব্যাপারে এরা মিথ্যা কথা বলতে পারে। শিক্ষিত লোক আরও বেশি পারে।
দ্বিতীয়টা হচ্ছে, সজ্জন, দুর্জন, ভদ্রলোক, অভদ্রলোক নানান রকম পাকিস্তানি আছে, থাকাই উচিৎ, একটা দেশে নানান ধরনের মানুষ থাকবে কিন্তু ১৯৭১ প্রশ্নে এরা সবাই একেক জন টিক্কা খান।
আজকে বাংলাদেশের জন্মদিন। এই দেশ ৪৫ বছরে পা দিয়েছে। আমার নিজের ৪৫ বছর হয়েছে কয়েকমাস আগে। আমি সহ আমার বেশিরভাগ বন্ধুবান্ধবই বাংলাদেশের সমবয়েসি। বাংলাদেশের শৈশবের গল্প আর আমাদের শৈশবের গল্প একই সময়কার।
সেই বিক্ষুব্ধ সময়ে বড় হতে হতে দেখেছি যে ইতিহাসের চাকা উলটো দিকে ঘুরানোর চেষ্টা হয়েছে। যেই প্রজন্মটার মুক্তিযুদ্ধকে সবচেয়ে বেশি করে ধারন করা উচিৎ ছিল সেটাই সবচেয়ে বেশি মগজ ধোলাই করা।
আমি বিস্মিত হই না যখন দেখি আমার অনেক বন্ধুর চিন্তাভাবনা কিছুটা আমার পাকিস্তানি সহকর্মীদের মতোই। ওনারা ডিফারেন্সিয়াল ইক্যুয়েশনের সমাধা করে ফেলতে পারেন নিমেষেই - কিন্তু সহজ সত্যটা অস্বীকার করতে পারেন অবলীলাতে। বাংলাদেশি মার্কিনিদের মধ্যে অনেকেই হিলারি বা বার্নি স্যান্ডার্সকে চান ক্ষমতাতে - কিন্তু নিজের দেশে হেফাজতে ইসলামকে দেখতে চান ক্ষমতায়। এ সবই আমাদের পাকিস্তান অভিমুখে যাত্রার ফলাফল।
কিন্তু আনন্দের বিষয় নতুন প্রজন্ম এই রকম নয়, এবং সর্বোপরি আমি এটা বিশ্বাস করি যে এটা পুরো বাংলাদেশের চিত্র নয়। মগজ ধোলাই সবচেয়ে হয়েছে শহুরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেনিতে।
স্বাধীনতার সুফল আমরা সবাই পেয়েছি। আমরা যে পাকিস্তান নই এবং পাকিস্তানি নই - সম্ভবত এটা সবচেয়ে বড় সুফল। আমরা সন্ত্রাসের প্রস্তুতকারী নই, সন্ত্রাসের পরিবেশক নই, সন্ত্রাসের দোকানদার নই। আমাদের সমস্যা আছে, দুর্নীতি আছে, দুঃশাসন আছে, খুন আছে, ধর্ষণ আছে - আছে না পাওয়ার বেদনা। কিন্তু মার্কিন দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৬ কোটি মানুষকে খাইয়ে, পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে।
দিনের শেষে আমাদের নিজেদের একটা দেশ আছে, একটা পতাকা আছে, সমস্যা সমাধানের সম্ভবনা আছে। এই সম্ভবনাটাই আমাদের সাথে পাকিস্তানিদের পার্থক্য।
যেই বরাহশাবকটা পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে খেলার মাঠে লাফ-ঝাঁপ দেয় - সেও স্বাধীনতার সুফল পেয়েছে। যেই সব শিক্ষিত ছাগল ফেসবুকে আজগুবি জিনিস শেয়ার দেয় - তারাও পেয়েছে। যেই প্রবাসী "লিবারেল বাংলাদেশি" নিজ দেশে হেফাজতের নারী নীতির বাস্তবায়ন চায় সেও পেয়েছে।
শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ!!! শুভ জন্মদিন!!!
"তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।
তুমি আসবে ব'লে, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে ব'লে, বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভূর বাস্তুভিটার
ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর।
তুমি আসবে ব'লে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতামাতার লাশের উপর।"

মীনা আর রাজু

মীনার কার্টুনের একটা এপিসোড আছে, মীনা আর রাজু দায়িত্ব বদল করে। মীনার কাজ রাজু আর রাজুর কাজ মীনার করতে হবে। সেটার থেকে উদ্ভুত শিক্ষা হচ্ছে পুরুষ আর নারী দুইজনের কাজের কোনটাই কম গুরুত্বপূর্ণ না সেটা শিশুদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া। তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করলে পুরুষ আর নারীর কাজের পার্থক্য থাকা উচিত না, কিন্তু...

মারিয়া তিন সপ্তাহের জন্য দেশে গিয়েছে। জরুরী প্রয়োজনে। আপাতত বাসাতে আমি মীনা এবং রাজু দুইটি ভূমিকাই পালন করছি। বাসার কাজগুলো সম্বন্ধে আমার মোটামুটি আইডিয়া আছে, আমি কাজ চালানোর মতো রান্না করতে পারি, ঘরদোর পরিষ্কার সবই করতে পারি। বাড়তি কিছু কাজ আছে, বাচ্চারা ঠিক সময়ে ঘুমাতে যাচ্ছে কিনা, পানি খাচ্ছে কিনা এইগুলোও মনিটর করতে হবে আমাকে।
পরিস্থিতি- ১
রাত এগারোটার সময়ে আমি বাচ্চাদের জানালাম ঘুমানোর সময় হয়েছে, বাতি নিভাতে হবে। একই সঙ্গে সারাদিন পান করা পানির পরিমাণ জানতে চাইলাম।
"হেই ইউ ক্যানট আস্ক ইট, ইউ আর নট মাই মাম...”
এমনিতে নারী পুরুষের সমতা নিয়ে মেয়েরা প্রায়ই আমাকে লেকচার দেয়। কিন্তু কার্যত দেখা গেল ভেতরে ভেতরে সবাই প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া।
আমি জানালাম আমি ইনচার্জ, সব খোঁজখবরের দায়িত্ব আবার।
উই ডোন্ট হ্যাভ টু লিসেন টু ইউ, কালকে স্কুল নেই, আমরা যতক্ষণ খুশি জেগে থাকতে পারি।
আরো জানালো বাড়াবাড়ি করলে মায়ের কাছে আমার নামে কমপ্লেইন করবে।
বেগতিক দেখে আমি আওয়ামী লীগের পথ ধরি, মানে হেফাজতকে যেমন তোয়াজ করে চলে আওয়ামী লীগ – সেই রাস্তাই ধরি। প্রয়োজনে আমি কঠোর ব্যবস্থা নেব, এই হুঁশিয়ারি দিয়ে নিজের ঘরে চলে যাই। আরো জানাই যে নিয়মভংগ করা আমি বরদাস্ত করবো না। নিজের ঘরে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে তাদের খিলখিল হাসি শুনতে পাই।
মনে মনে ক্ষমতাসীন দলকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। একটা প্রব্লেম সলভড। আমার কাজ হবে নিয়মগুলো জানানো, প্রয়োগ করতে গেলে ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের সামনে পড়বে। কী দরকার এতো ঝামেলার।
পরিস্থিতি- ২
আজকের মেনু হচ্ছে ভাত, ডাল, সব্জি আর সালাদ। ডিনার দেওয়া হবে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটাতে। যথাসময়ে ডিনার দিলাম। এরপরে আগের প্রশাসন বাচ্চাদের খেতে আসার জন্য ঘন্টাখানেক ডাকাডাকি করতো, কিন্তু নতুন প্রশাসনে আমি ব্যক্তি স্বাধীনতাতে বিশ্বাস করি। খিদে লাগলেই খাবে। ঘন্টাখানেক পরে তাই হোল।
আই ডোন্ট লাইক দ্যাট ভেজি...
ভালো না লাগলে খাওয়ার দরকার নাই।
হোয়াই আর ইউ সো রুড?
বোবার শত্রু নাই। চুপ থাকি।
দিজ ভাত ইজ টু সফট। মামা'স রাইস ইজ বেটার দেন ইউরস।
আমি নিশ্চুপ থাকি। ভাত একটু জাউ জাউ হয়ে গেছে। ভাত যে কড়কড়ে হবে এই রকম কোন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নাই। একটু পরে ফোনে শুনলাম বলছে..
মা' আব্বুর ভাতটা নরম হয়ে গেছে।
স্টপ ট্যাটেল টেইলিং...
ডোন্ট বি মিন...
আরে নাহ, আই ওয়াজ জোকিং...খাবাররের পরে আইসক্রিম কে চায়?
পরিস্থিতি- ৩
থার্মোডিনামিক্সের কয়েকটা সূত্র আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক হচ্ছে দ্বিতীয় সূত্র। দ্বিতীয় সূত্রের একটি অনুসিদ্ধান্ত হয়েছে এই মহাবিশ্বের চরিত্র খুব ডিজঅর্ডার্ড আর র‍্যান্ডম, মানে ঘটনা গুলো গোলযোগপূর্ণ, আর সব কিছু শেষ পর্যন্ত ব্যারাচ্যারা অবস্থাতে পৌঁছায় যায়।
এই সূত্রের বাস্তব প্রয়োগ প্রতিদিনই দেখা যায়। একটা বিরাট উদাহরণ হচ্ছে ঘর দোর পরিষ্কার করার পরের মিনিট থেকেই ঘর অপরিষ্কার হতে শুরু করে। থার্মোডিনামিক্স আরও বলে যে অর্ডার আনতে হলে সিস্টেমে শক্তি দিতে হবে, এমনিতে ছেড়ে দিলে ছাড়া গরুর মতো অবস্থা হবে। সূত্রের কথা অনুযায়ী আমি ঝাড়ু হাতে নেমে পড়ি। সারা সপ্তাহ ময়লা হতে দিলে উইকেন্ডে প্রচুর শক্তি ব্যয় হবে। আগে এই শক্তি দুই জন মানুষ দিতো, এখন পুরাই যাবে আমার একাউন্ট থেকে। তাই প্রতিদিন ঝাড়ু দেওয়া শুরু করি।
হোয়াই ডু উই হ্যাভ টু ক্লিন এভরি ডে?
ঘর পরিষ্কার করতে অবশ্য মেয়েও হাত লাগায়। আমি এর বিনিময়ে পয়সা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেই। অর্থ যে শক্তির আরেক রূপ সেটা থার্মোডিনামিক্সের বইতে লেখা নেই, কিন্তু আমরা বিলক্ষণ জানি।
থার্মোডিনামিক্সের ভবিষ্যতবাণী অনুযায়ী আরও কেওস দেখা যায় সিংকে জমতে থাক ডিশের স্তুপে। লন্ড্রি বাস্কেটে, লন্ডভন্ড বিছানাতে, বাইরের বাগানের নেতিয়ে পড়া গাছে। আমি টের পাই অভিকর্ষ বলের আবিষ্কার যদি আপেল গাছের নিচে হয়, তাহলে থার্মোডিনামিক্সের সূত্রের আবিষ্কার আমার মতো পরিস্থিতে কেউ বের করেছিল।
সূত্রটা একটু মোলায়েম হলে কী অসুবিধা ছিল?
পরিস্থিতি- ৪
এই দেশে বাচ্চাদের "চোর" থাকে। বাংলা চোর নয়, ইংরেজি চোর। সেটার অর্থ হচ্ছে বাড়ির নির্দিষ্ট কাজ বাচ্চাদের করতে হবে। মারিয়া দেশে যাওয়ার পরে আনুশার কাজ হচ্ছে বাইরের গাছে পানি দেওয়া।
রাত এগারোটার সময়ে মনে পড়ল আমার। আনুশাকে জানালাম।
"ক্যান ইউ প্লিজ ডু ইট, আই এম টু টায়ার্ড?"
আমি বাইরে গিয়ে গাছে পানি দেই। বিছানায় এসে ঘুমের অতলে ডুবে যেতে যেতে মনে হল কি যেন একটা ঠিক নেই। পরদিন সকালে আবিষ্কার করলাম পানি দেওয়ার পরে কলটা বন্ধ করা হয় নি! ঘাসগুলো একটু বাড়তি পানি পেল আরকি!!
প্রতিদিনই আনুশাকে স্মরণ করাই। একদিন আনুশার করতে ইচ্ছে করে না, আরেকদিন হোমওয়ার্ক থাকে, অন্যদিন টিভিতে সিরিজ দেখে মন খারাপ। কোন দিন বৃষ্টি এসে বাঁচিয়ে দেয়, কোন দিন আমি পানি দিয়ে কলটা ভালো মতো বন্ধ করে আসি।
একই সঙ্গে মনে পড়ে আনুশার বয়েসে আমিও ওই রকমই ছিলাম। প্রতিটা কাজই ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতাম। সেই আমাকেই এখন সব কিছু করে খেতে হচ্ছে। সময় সবাইকেই বাধ্য করে, যতদিন পারুক সময়ের সাথে লুকোচুরি খেলে নিক, ফাইনালি সময় ঠিকই ধরে ফেলবে!!!
টিল দেন গুড জব আনুশা!