Showing posts with label স্কুল. Show all posts
Showing posts with label স্কুল. Show all posts

Friday, July 30, 2021

বাঁটু করিম

আনওয়ারুল করিম নামে আমাদের এক স্যার ছিলেন। অংকের স্যার। আমরা যখন থ্রিতে পড়ি তখন স্যার ল্যাবরেটরি স্কুলে এলেন। আমাদের ক্লাসের শ্রেণী শিক্ষক। অতি দ্রুতই স্যারের নাম হয়ে গেল বাঁটু করিম, আমাদের বা আমাদের আশেপাশের ব্যাচেরই দেওয়া নাম। বাঁটু নামটার শানে নযুল ব্যাখ্যার দরকার নেই।


কিছুদিন পরে বাঁটু করিম নামটা সংক্ষিপ্ত করে দেওয়া হলো। হয়ে গেল বিকে। মাঝে মাঝে টাইটেল আসল নামকে ছাড়িয়ে যায়। বিকের ব্যাপারে তাই হলো। বিকে নামটা ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে গেল। সবাই তাঁকে বিকে স্যার হিসাবে জানে, জন্মসূত্রে "একে" কর্মসূত্রে হয়ে গেলেন "বিকে"।

আমার এবং আমাদের বন্ধুদের স্কুল জীবনটার একটা অংশ কেটেছে বিকের আতংকে। ক্লাস থ্রি, ফাইভ, সেভেন, নাইন, টেন - প্রতি শ্রেণীতে তিনি অংক শিক্ষক। যোগ বিয়োগ দিয়ে শুরু করে - ভগ্নাংশ, শতকরা, উৎপাদকে বিশ্লেষণ, ত্রিকোনমিতি, ঘন জ্যামিতি - সবর্ত্রই বিকে। পাঞ্জাবি, পায়জামা পরা সাদামাটা অংকের যাদুকর। এর হাত থেকে পালানোর উপায় নেই। নিউমার্কেটে স্যারের কাপড়ের দোকান আছে (নামটা মনে আছে - টপ ইন দ্য টাউন), ওখানে সন্ধ্যার পরে ঘোরাঘুরি করতে গেলে স্যারের নজরে আসার সম্ভবনা আছে - যেটার ফলাফল হবে পরদিন অংক ক্লাসে নাজেহাল।

নাজেহালের বর্ণনা দেওয়া যায়। স্যার নিজের ডাস্টার আনতেন, সেই সাথে স্কুলের পিকনিকের সময় মধুপর থেকে আনা ডোরাকাটা সাদা বাদামী বেত আসতো কখনো কখনো। বিকে প্রায় প্রতি ক্লাসে বোর্ডে অংক করতে পাঠাতেন। প্রায় সব ছাত্রের নাম ও রোল নম্বর জানা ছিল স্যারের - সেই সঙ্গে কে কেমন অংক জানতো সেটাও বিলক্ষণ জানতেন। স্যারের ভাষাতে যারা "দুর্বল সেন" তাদেরকে বোর্ডে পাঠানো হতো অঙ্ক করার জন্য।

যারা জানেনা তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি - স্কুলের বোর্ডে অংক ঠিকঠাক মতো করা পৃথিবীর পাঁচটা জটিল কাজের একটা। অংকে ভুল করা ছাত্রদের লাইনে দাঁড়া করানো হতো। সেই কঠিন জালে ভালো ছাত্রেরাও আটকা পড়ত প্রায়ই, কেননা বোর্ডের সামনে দাঁড়ালেই যাবতীয় জ্ঞান মাথা থেকে দূর হয়ে যায়।

যাই হোক মোটামুটি সংখ্যক ছাত্র জমা হলে স্যার বলতেন এই বার এরা খেলা দেখাবেন। এরপরে স্যার যত্ন করে নিজের হাতের ঘড়িটা খুলে টেবিলে রাখতেন, আস্তে আস্তে পাঞ্জাবির আস্তিন গুটাতেন...এরপর খেলা শুরু হতো। খেলাটা হচ্ছে ডাস্টার দিয়ে পিঠের মধ্যে দমাদম বাড়ি, অথবা বেত দিয়ে সপাং সপাং বাড়ি। প্রায়ই দেখা যেত বেত ভেঙ্গে গেছে। সেই বেত ভেঙ্গে গেলেও স্যার দমতেন না, অফিস রুম থেকে আরেকটা আনা হতো। স্যার এমনকি স্কুলের গাছের ডাল ভেঙ্গেও ছাত্রদের "পৃষ্ঠপোষকতা" করেছেন। একবার আমাদের বন্ধু জাকিরকে অন্ধের মতো পিটাতে পিটাতে ঘন্টা পড়ে গিয়েছিল, স্যার বিদায় নেবার সময়ে জানালেন সিক্সথ পিরিয়ডে এসে আবার জাকিরকে মারবেন। ক্লাসের প্রতিটি ছেলে মার খেয়েছে এমন ঘটনাও বিরল না। স্যার কৌতুক করে বলতেন যে - এমন জায়গাতে উনি মারবেন যে বাসাতে গিয়ে কেউ অভিভাবককে প্যান্ট খুলে দেখাতে পারবে না।

বাটু করিমের অংক বোঝানোর স্টাইলটা অবশ্য চমৎকার ছিল। সত্যিকথা বলতে এতো ভালো অংকের শিক্ষক আমি এই জীবনে আর দ্বিতীয়টি পাইনি। কিন্তু একই সঙ্গে বলতে হচ্ছে স্কুল জীবনে দেখা উল্লেখযোগ্য ধরণের সাইকো হচ্ছেন বাঁটু করিম। এমনও দিন গেছে যে আমি সকালে যে অংকটা বাসা থেকে করে এসেছি, সেটা বোর্ডে গিয়ে পারিনি। বহুরাতে দুঃস্বপ্ন দেখেছি, বহু রাতে দোয়া দরূদ পড়েছি যেন স্যার পরদিন স্কুলে না আসেন অথবা অকস্মাৎ ভূমিকম্পে যেন স্কুলের বিল্ডিংটা ধ্বসে পড়ে।

বলা বাহুল্য যে সেই সব দোয়া কবুল হয় নি। আমাদের এই স্টিম রোলারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। বহু কষ্ট করে আমিও শেষ পর্যন্ত অংক শিখেছি - সত্যি কথা বলতে স্কুল জীবনের পরে যেসব অংক শিখেছিলাম সেগুলো সব মাথা থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে - শুধু রয়ে গিয়েছে ক্লাস টেনের পাটিগণিত আর সেই সঙ্গে রয়ে গেছে কালান্তক বাঁটু করিম। মেয়ের অংকে সাহায্য করতে গিয়ে আটকে গেলে এখন আমার মনে হয় ডাস্টার হাতে আড়ালে কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন স্যার।

ঈশ্বর আমাদের অবশ্য একটা করুণা করেছেন। বাঁটু করিম নামটা পার্মানেট হয়ে গেছে - আমরা পাশ করে আসার ত্রিশ বছর পরেও স্যারকে এই নামেই ডাকতে শুনেছি সবাইকে। মনে হয় আমাদের তরফ থেকে এইটুকু প্রতিশোধটা রয়ে গেল। খ্যাতি বাড়তে বাড়তে তিনি হয়ে গেলেন প্রবাদতুল্য অংকের শিক্ষক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সবাই তাঁকে এই নামেই চিনে। অভিভাবকেরা স্যারের বাসাতে কলিং বেল চাপ দিয়ে খুব বিনীতস্বরে জিজ্ঞেস করেন - বিকে স্যার বাসায় আছেন? শুনেছি স্যার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন - কিন্তু অভিভাবককে তো আর ডাস্টার দিয়ে পিটানো যায় না!

কেমন আছেন স্যার? উনি বেঁচে আছেন কিনা জানি না, আমি ওনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি যেন এক সকালে কড়া নেড়ে জিজ্ঞেস করতে পারি - বিকে স্যার কেমন আছেন?

###

Tuesday, January 5, 2021

আসাদুজ্জামান স্যার

 আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী নামে আমাদের এক স্যার ছিলেন। কেউ কেউ তাকে আজাসি বলতো, দুষ্ট ছেলেরা আড়ালে আসাদুজ্জামান টিকটিকি বলে ডাকতো। উনি প্রায়ই সাদা প্যান্ট, হাফশার্ট পরে স্কুলে আসতেন। দেখে মনে হতো ক্রিকেট খেলতে বা মাছ ধরতে যাবেন। দ্বিতীয় কাজটা উনি সত্যি সত্যি করতেন। ছোটখাটো ঠাণ্ডা মানুষ। একবার তিনি ক্ষেপে গেলেন। স্যার কি একটা কাজে সেন্ট জোসেফ স্কুলে গিয়েছিলেন। ওইখানে গিয়ে দেখেছেন ক্লাসের বোর্ডগুলো অনেক চওড়া। আরও অসাধারণ ব্যাপার হচ্ছে চক দিয়ে লিখতে লিখতে অন্য মাথায় চলে গেলে সেখানেও মোছার জন্য একটা ডাস্টার। অর্থাৎ দুটো ডাস্টার। 

পক্ষান্তরে আমাদের ল্যাবরেটরি স্কুলে চিপা একটা ব্ল্যাক বোর্ড। দুঃখের বিষয় কোন ডাস্টারও নেই, চক মোছার জন্য একটা ময়লা ন্যাকড়া। স্যারের গলার স্বর সাধারণতঃ নিচু থাকতো, পড়ানোর সময় সেটা নিচে নামতে নামতে প্রায় শ্রবণসীমার নিচে নেমে যেত। কিন্তু স্যার মাঝে মাঝে ন্যাকড়া হাতে নিয়ে সেন্ট জোসেফ স্কুলের ডিলাক্স বোর্ড আর ডাস্টার নিয়ে হাহাকার করতেন। তখন স্যারকে আমরা পরিস্কার শুনতে পারতাম। না-দেখা সেন্ট জোসেফ স্কুলের বোর্ডের কারণে সংকুচিত বোধ করতাম। কিন্তু আমরা কোনদিন ডাবল ডাস্টারের লেভেলে পৌঁছাতে পারি নি। আমাদের ব্ল্যাকবোর্ডও বড় মনিটরের মতো উদার হতে পারেনি। 

আমার অফিস রুমে একটা হোয়াইট বোর্ড আছে। রুমে আরও লোক থাকার ব্যবস্থা থাকলেও লে-অফের কবলে পড়ে এখন আমি একমাত্র ব্যক্তি। সেইদিন এক সহকর্মী এসে বলল - আরে তোমার রুমের হোয়াইট বোর্ডটা দেখি বেশ চওড়া আর বোর্ডের দুই কোনাতে তুমি দেখি দুটো ইরেজার (ডাস্টার) রেখেছো।

আমি কিছুই রাখি নি, ওই দুটোর একটাও আমি জোগাড় করিনি। কে জোগাড় করেছে সেই ধারনাও আমার নেই, কে জানে সে হয়তো সেন্ট জোসেফ স্কুলের ছাত্র ছিল। 

কিন্তু এটা যে রাখলে অনেক সুবিধা, সেটা আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী স্যার বারবার বলতেন। অনেক হাহুতাশ করতেন। স্যার কলকাতায় চোখের চিকিৎসা করতে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। নিঃসন্তান ছিলেন - কলাবাগানের বাসার সামনে বসে রেডিওতে খেলা শুনতেন। সামনের রাস্তায় ছাত্রদের কাউকে দেখতে পেলে ডাকতেন - আমার অনেক সিগারেট ফেলে দিতে হয়েছে ওনার কারনে। 

আমার কলিগ দুটো ডাস্টারের একটা নিয়ে চলে গেল। আমার দেওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল না। আমি সাপ্লাই ক্যাবিনেট খুঁজে-পেতে আরেকটা ডাস্টার পেলাম, শূন্যস্থান পূরণ করে দিলাম। 

মনে মনে আমি ৩০ বছরের পুরনো একটা সমস্যার সমাধান করলাম - আর হঠাৎ করেই জেলখানার মতো এই অফিসে ঢুকে পড়ল এক টুকরো শৈশব।


আমাদের হাশেম স্যার

হাশেম স্যার আমাদের অংক করাতেন। ছোটখাটো মানুষ। বাদামি রঙের প্যান্ট আর সাদা সার্ট পরতেন। আমি স্যারকে এর বাইরের কোন পোশাকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। স্যারের আলমারীতে এই রঙের অনেকগুলো জামা কাপড় থাকার কথা। একদম ক্লাস ওয়ান থেকে আমরা স্যারকে পেয়েছি। ওনাকে দেখলেই আমরা খুশি হতাম। হাশেম স্যারের ক্লাস মানেই অবাধ ছুটি, মারধোরের কোন সম্ভবনা নেই। আনন্দঘন পরিবেশে ক্লাস চলবে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য আনন্দ। সেই উদ্দেশ্য পুরোই সফল।

বড় হয়ে আমরা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে আড্ডা দেওয়ার সময়ে প্রায়ই স্যারকে দেখতাম, রিকশা করে সায়েন্স ল্যাবরেটরির দিকে যাচ্ছেন। একদিন তাঁকে এক ঘন্টায় তিনবার দেখা গেল, প্রতিবারই তিনি যাচ্ছেন, ফিরছেন না। এই রহস্যটা নিয়ে আমরা অনেকদিন আলাপ করেছি। সেই সময়ে আমাদের উনি অংক শিখাতেন। চ্যাপ্টারের প্রথম অংকটা করিয়ে উনি দুই থেকে পঞ্চান্ন নম্বর অংক হোমওয়ার্ক হিসাবে দিয়ে দিতেন। সঙ্গত কারণেই কেউ কোনদিন সেই হোমওয়ার্ক শেষ করেছে বলে আমি শুনিনি। একদম নিপাট ভালো মানুষ বলতে যা বুঝায় ঠিক তাই। আমরা এই ভালোমানুষীর পূর্ণ সদ্বব্যবহার করে চলছি তখন। হাশেম স্যারের ক্লাস ছিল টিফিন টাইম শেষ হওয়ার পরের পিরিয়ডে। আমরা টিফিন টাইমে স্কুলে থেকে বের হয় স্যারের ক্লাস শেষ হওয়ার ঠিক আগে আগে পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে সিটে বসে পড়তাম। ক্লাসরুমের বাইরেও অনেক কিছু শেখার আছে, ততদিনে আমরা সেই তথ্য পেয়ে গেছি। বাইরের পৃথিবীটা আমাদের ডাকছে - চিটাগং হোটেলের কিমা পরোটা থেকে বেনসন হেজেস সব কিছুতেই হাতেখড়ি করতে হচ্ছে।
আমাদের এই প্রতিদিনের অভিযান একদিন হেডস্যারের কানে গেল। উনি স্কুলে রেইড দিয়ে আমাদের গ্রেপ্তার করে হাশেম স্যারের ক্লাসে নিয়ে আসলেন। সব মিলিয়ে ১৫/২০ জন ছাত্র, ক্লাসের প্রায় অর্ধেক ছাত্রই আটকা পড়েছে এই শুদ্ধি অভিযানে। হেডস্যার এবং আরো কয়েকজন স্যার বিরাট বক্তৃতা দিলেন, আমাদের ইহকাল আর পরকাল দুইটাই প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এটা জানলাম। ক্লাসের ক্যাপ্টেন (যে বর্তমানে আমার প্রতিবেশি) কোথায় খোঁজা হল, তাকেও পাওয়া গেল গ্রেফতারকৃতদের তালিকাতে। আমাদের শাস্তি হিসাবে বেত্রাঘাত ধার্য হল। সবাই ১০ টি বাড়ি পাবে, ক্লাসের ক্যাপ্টেনকে ১৫ টি বাড়ি দেওয়া হবে। হেডসার ছাড়াও সেই বিচারসভাতে স্কুলের যাবতীয় টেরর স্যারের হাজির। হাশেম স্যারের ক্লাসেই সব হচ্ছে। উনি ঘটনার আকস্মিকতাতে বিমূঢ় হয়ে গেছেন। সেই সঙ্গে যেই কেয়ামত সমাসন্ন তাতে আমাদের চেয়ে ওনাকেই বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হচ্ছিল। বিচিত্র কারণে হেডস্যার বা অন্য স্যারেরা কেউ মারলেন না। যেহেতু হাশেম স্যারের ক্লাস থেকে নিত্যই আমরা পালাচ্ছি, সেহেতু ওনাকে দেওয়া হল শাস্তি কার্যকরের গুরুদায়িত্ব। হেড স্যার বেতগুলো সাথেই এনেছিলেন। হাশেম স্যারের হাতে ওগুলো দিয়ে সবাই চলে গেলেন।
হেড স্যার চলে গেলে হাশেম স্যার নাতিদীর্ঘ একটা ভাষণ দিলেন। মারধোর ওনার পছন্দ না, কিন্তু আমাদের বাড়াবাড়ি এমন পর্যায়ে গিয়েছে, এই শাস্তি হেডস্যার বাধ্য হয়ে দিয়েছেন। আমাদের মঙ্গলের জন্য এই শাস্তি, হেডস্যার যেহেতু দিয়েছেন, এই শাস্তি কার্যকর হতে হবে। হাশেম স্যার বেত হাতে এগিয়ে এলেন - প্রথম অভিযুক্ত প্রস্তুত - স্যার অনেক উঁচুতে বেতটা নিয়ে প্রবল বেগে নিচে নামালেন এবং মারার ঠিক আগের মুহূর্তে বেতের গতিবেগ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসলেন। হালকা একটা টোকার মতো লাগলো মনে হয়। বাকিরা তটস্থ হয়ে ছিল, কিন্তু দেখা গেল প্রবল বেত্রাঘাত শরীর স্পর্শ করার আগে মোলায়েম রূপ ধারণ করছে। আমাদের চাপা হাসি আর চাপা থাকলো না। হাশেম স্যার একদম হেডস্যারের বিধান অনুযায়ী শাস্তি দিচ্ছেন আর পুরো ক্লাস জুড়ে হাসির হুল্লোড়। ভয়ানক হতে পারতো এমন একটি দিন শেষ পর্যন্ত আনন্দমুখর হয়ে উঠল।
হিসেব করে দেখলাম এই ঘটনার পরে প্রায় ৩৫ বছর পার হয়ে গেছে। স্কুলের দিনগুলো প্রায় আগের জীবনের গল্পের মতো লাগে। আমার প্রতিদিনের বাস্তবতাতে তাদের কোন চিহ্ন নেই। সেই স্কুল পালানো বালকেরা এখন একেকজন ধূসর ভদ্রলোক, জীবন থেকে পালানোর কোন উপায় নেই তাদের, হেডস্যারের ভূমিকাতে জীবন নিজেই আছে। বেত্রাঘাত আছে অন্য পোশাকে - তাদের নাম দুঃখ, শোক, পরিতাপ, স্ট্রেস। আমাদের ব্যক্তিগত ক্লজেটে আছে বিষাদ আর হাহাকার।
আজকে সকালে খুব খুব ব্যস্ত ছিলাম কাজে। হঠাৎ করেই ফেসবুক বন্ধু ইসমাইলের ছবি ভেসে উঠল। ইসমাইল হাশেম স্যারের ছেলে - আমাদের সাথেই পড়ত। আমি স্কুল ছাড়ার পরে আর দেখিনি, কিন্তু ফেসবুকের কল্যানে আজকাল খবরাখবর পাই। সেই মধ্যবয়েসি ইসমাইলের মুখের রেখাতে হাশেম স্যারের আদল হঠাৎ করে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল ল্যাবরেটরি স্কুলের ক্লাস টেনের বারান্দাতে দীর্ঘ হতে থাকা এক বিকেল বেলায়। একটা ডেডলাইনের মিট করার জন্য প্রাণপণ কাজ করছিলাম, সেই ব্যস্ত দিনে হাশেম স্যার বাদামী প্যান্ট আর সাদা সার্ট পরে হাজির, সত্যি কথা বলতে এই চাপময় দিনটা চমৎকার গেছে স্যারের কল্যানে, ঠিক ৩৫ বছর আগের দিনটার মতোই। স্যারের জন্য আজও বেঁচে গেলাম।
আমি "দৌড়" নামে একটা লেখা লিখেছিলাম। তাতে আমাদের স্কুলের ভয়াবহ সব স্যারদের কথা বলেছিলাম। একজন মন্তব্যে বলেছিলেন ভালো স্যারদের কথাও যেন লিখি। হাশেম স্যারের কথা না লিখলে সম্ভবত অন্যায় হয়ে যাবে। আমার মনে আছে স্কুলের বারান্দাতে স্যারকে দেখলেই আমাদের আনন্দ হত, অন্য কোন স্যারের বদলে হাশেম স্যার ক্লাস নিতে আসলে প্রত্যেকেই খুশি হত। ভালোবাসার শক্তি ব্যাপক, তার ব্যাপ্তি বহুদূর - এই যে আজকে ৩৫ বছর পরে আপনাকে এই ব্যস্ত সকালে মনে পড়ে গেল - এই "হতে পারতো কঠিন" দিনটাও চমৎকার হল সেই অলখ ভালোবাসাটার জন্যই। সেই ভালোবাসাটাই প্রতিদিন দুর্লভ থেকে দুর্লভতর হয়ে যাচ্ছে।
আপনাকে আমাদের ধন্যবাদ জানানো হয় নি। ধন্যবাদ জানানো হয় নি আরো আরো অনেককেই। ক্রোধ আর না পাওয়াতে পরিপূর্ণ এই পৃথিবীতে ভালোবাসার কথাও ভুলে যেতে হয় হরদম। আপনাকে ধন্যবাদ প্রিয় হাশেম স্যার, এতোকাল পরেও আপনাকে নির্ভুল ঠিক ঠাক মনে পড়ে ব্যস্ত দিনের মাঝে।
যেইখানেই থাকুন, স্যার ভালো থাকুন।
###

অসূর্যম্পশ্যা

"যে নারী কোনদিন সূর্যের মুখ দেখেনি, এক কথায় কি হবে - কে বলতে পারবে?” - জোবেদ আলী স্যার পুরো ক্লাসের দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন।

মোটা দাগে আমাদের ক্লাসকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একদল হচ্ছে যারা পড়াশুনা করে, স্যারেরা পড়া ধরলেই লাফ দিয়ে উত্তর দেয়। অপর দল হচ্ছে দার্শনিক টাইপের। পড়া ধরার সময়ে এরা উদাস মুখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। এদেরকে স্যারেরা কিছু জিজ্ঞেস করলে চোখেমুখে একটা বিশুদ্ধ বিস্ময় ফুটে উঠে। এরাই ক্লাসের সংখ্যাগরিষ্ঠ। পৃথিবীর সর্বত্রই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই দুই ভাগে বিভক্ত। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময় আমার মনে হতো, ভালো ছাত্ররাই মূলত আসে এইখানে, কিন্তু ঢোকার পরে এরাও ভালো আর খারাপ ছাত্রের সেই মৌলিক বিভেদে বিভক্ত হয়ে পড়ে তারা।
জোবেদ আলী স্যারের প্রশ্নের উত্তরে একমাত্র বায়েজিদ হাত তুলল। বায়োজিদ সম্ভবত ভালো ছাত্রই ছিল। কিন্তু সে ঠিক সেই রকম চটপটে ভালো ছাত্র না। বাকিদের থেকে অনেকখানি লম্বা, ঢ্যাঙ্গা টাইপের, খুব শুকনো, চোখটা একটু জ্বলজ্বলে এবং খুবই চুপচাপ। বায়েজিদের সম্ভবত হৃদরোগের সমস্যা ছিল। ক্লাসের বাকি ভালো ও খারাপ ছাত্রদের সাথে ওর পার্থক্যটা বোঝা যেত। কেমন দুঃখী দুঃখী একটা চেহারা ছেলেটার।
জোবেদ আলী স্যারের কথা একটু বলা যাক। স্যার বাংলার শিক্ষক ছিলেন। স্যারের চেহারাটা মনে আছে। ছিপছিপে লম্বা, মাথাতে টাক, যত্ন করে রাখা ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি, মোচ – স্যারকে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের আশ্চর্য ডাবল বলা যায় প্রায়। ৫০ সিসির হোন্ডা চালান, সকালে স্কুলের এসেম্বলিতে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার দলকে স্যার নেতৃত্ব দেন, গাইতে গাইতেই মাঝে মাঝে হালকা চড় থাপ্পড় মারতেন – জাতীয় সঙ্গীতের দুই লাইনের মাঝখানে চাপাস্বরে ধমক দিতেন - গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না কেন?
জোবেদ আলী স্যার পত্রিকাতেও লিখতেন। ওনার লেখা চিত্রবাংলা পত্রিকাতে প্রায়ই ছাপা হতো। চিত্রবাংলা সিনে পত্রিকা। চিত্রবাংলার সম্পাদক মিজানুর রহমান ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক, মাস্টারি ছেড়ে সিনেমার পত্রিকা বের করেছেন। ওইখানে রগরগে সব আর্টিকেলের পাশাপাশি কিছু জ্ঞানের কথা বের হতো, সেইগুলোর অনেকগুলোই জোবেদ আলী স্যারের লেখা।
বায়োজিদ আস্তে আস্তে জবাব দিল – স্যার এক কথায় একে বলে অসূর্যম্পশ্যা।
শব্দটা আমি প্রথম শুনলাম। স্যার চমতকৃত হলেন। এবার জিজ্ঞেস করলেন বায়োজিদকে যে সে এটা বানান করতে পারবে কিনা। পারলে একটা পুরস্কার দেওয়া হবে। বায়োজিদ বোর্ডে গিয়ে গোটা গোটা করে লিখলো - অসূর্যম্পশ্যা। স্যার বানানটা শুদ্ধ ঘোষণা করলেন। ক্লাসে হাততালির রোল উঠলো।
জোবেদ আলী স্যার আসলে বেশ ভালো পড়াতেন, সেটা আমি অনেক পরে বুঝেছি। স্যার খুব শুদ্ধ করে কথা বলতেন। আমাদের সম্ভবত ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ করিয়েছিলেন – বার বার বলতেন অনুবাদ সরাসরি করতে হয় না। অনুবাদ হবে ভাবের অনুবাদ। আমি জীবনে একবার একটা অনুবাদ কর্মে হাত দিয়েছিলাম, করতে গিয়ে বার বার মাথার ভেতরের অদৃশ্য কোন জোবেদ আলী স্যারের ধমক শুনছিলাম। তিন লাইন অনুবাদ করার পরে আর সেই পথে পা মাড়াই নি। এর পাশাপাশি বানান ভুল না করার জন্যও বারে বারে বলতেন, বলতেন বানান নিয়ে সন্দেহ থাকলে অভিধান দেখতে।
ভাষা নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা অনেকটা ভাসাভাসাই ছিল। আমি বহু বহু বছর পরে বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি, যত্ন করে লালন করার চেষ্টা করেছি। পরিণত বয়েসে এসে জোবেদ আলী স্যারকে আবার হঠাৎ করে মনে করা শুরু করেছি। আরো একটা ব্যাপারও মনে পড়ল, স্যার ক্লাসে ঢুকতে ঢুকতে ছাত্রদের সালাম দিতেন। আমরা একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার জানালেন এই ছাত্রেরা একদিন বড় মানুষ হবে, সেই মানুষগুলোকেই উনি সম্মান জানান। স্যারের ক্লাসে মারধোর হতো না, কথা বলাও বারণ ছিল না। তিনি চাইতেন তাঁর ছাত্রেরা সফল মানুষ হওয়ার বদলে ভালো মানুষ হোক। এমন একজন মানুষকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব।
আমরা নাইনে বা টেনে উঠতে উঠতেই স্যার বদলি হয়ে গেলেন অন্য কোথাও। আমরা টিচার্স রুমে স্যারকে বিদায় জানাতে গেলাম। অনেকদিন এই স্কুলে পড়িয়েছেন, একটু বিমর্ষই লাগছিল তাঁকে। বলেছিলেন – আবার দেখা হবে।
স্যারের সাথে এই জীবনে আর দেখা হয়নি, উনি বেঁচে আছেন কিনা সেটাও জানিনা। আর অনেকের মতো স্যারও হারিয়ে গেছেন। বায়েজিদের কোন খবর জানি না, স্কুল ছাড়ার পরে সেও হারিয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দলবেঁধে ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম জমা দিতে গিয়ে হঠাৎ দেখেছিলাম একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি পড়ে আছে মাটিতে। ছবিটা বায়োজিদের – আমরা এদিক ওদিক খুঁজলাম, ডাক দিলাম, সাড়া মিললো না। বায়েজিদকে পাওয়া গেল না কোথাও। সে বেঁচে আছে কিনা সেটাও জানি না।
এই রকম বহু বহু মানুষকে হারিয়ে ফেলেছি। হারিয়ে ফেলা আসলে চলমান প্রক্রিয়া, জীবনে চলতে চলতে যেমন অনেক প্রাপ্তি জুটে তেমনি হারাতেও হয় অনেক কিছু। যত দীর্ঘ জীবন ততই বড় হারানোর তালিকা। কাউকে হারিয়েছি সুদূর অতীতে, কাউকে বর্তমানে, কাউকে ভবিষ্যতে হারাবো। দুপুরের খর রোদে বাইরে বসে থাকতে বিচিত্র কারণে মনে পড়ে বহুদূরের এক শান্ত ক্লাসরুম, বাইরে আলোছায়ার খেলা আর গোটা গোটা অক্ষরে বোর্ডে লেখা - অসূর্যম্পশ্যা।
আমি মাঝে মাঝে টের পাই জীবনটাই আসলে একটা দীর্ঘ হারানো বিজ্ঞপ্তি।