Thursday, March 10, 2011

ঋণ, রাজনীতি আর নোবেল প্রাইজ

ইউনূস সাহেবকে নিয়ে আমার বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই। আমি যেই শহরে থাকি সেই শহরে উনি কয়েকবার এসেছেন। আমি একবার কথাও বলেছি উনার সাথে। সুদের হার নিয়ে প্রশ্ন করেছি ওনাকে, ওনার উত্তর ছিল ঝানু ব্যাংকারের মত। হিসেব কষে আমাকে বুঝালেন যে গ্রামীন ব্যাঙ্ক অন্যদের চেয়ে বেটার। কিন্তু ওনার নোবেল প্রাপ্তিতে আমিও খুশি হয়েছি, আর দশজন বাংলাদেশির মত।

ঋণ খারাপ না ভালো এই প্রশ্নের উত্তর সহজ। ঋণ খারাপ, খুবই খারাপ। কিন্তু বাপের টাকা না থাকায় ঋণ করেই পড়েছি। চাকরি করে শোধ করেছি ঋণ। ঋণ করে বাড়ি কিনেছি, গাড়ি কিনেছি...শোধ করে যাচ্ছি...ঋণ ভালো না হলেও জীবনে ঋণ করতে হয় প্রায় সবাইকেই। সবাই ঋণের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারে না, কেউ ঋণ করে পড়াশোনা বা ব্যবসা করে স্বচ্ছলতা আনবে আবার কেউ ঋণের টাকায় ঘি খাবে। কারো ব্যবসা ফেল বা লে-অফ হয়ে ঋণখেলাপি হবে। এটা ঋণের সহজ সত্য।

ইউনূসকে সুদখোর বললে দেশে যত ব্যবসায়ী বা ব্যাঙ্কার আছে সবাইকে মহাজন বলতে হয়- কেননা সুদ সবাই খাচ্ছেন। অনেক রিটায়ার্ড সরকারী কর্মকর্তাও সঞ্চিত টাকাগুলোর সুদেই চলছেন। এই সুদ ব্যাঙ্ক দিচ্ছে কিভাবে? ওরা তো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়।

ইউনূস সাহেবের আইডিয়াটা ইউনিক, উনি যাদের ঋণ দিয়েছেন তারা সাধারণ বিচারে ঋণ পাওয়ার "যোগ্য" নয়। ধনী-গরীব নির্বিশেষে ঋণকারীর চরিত্র প্রায় একই। ঋণ পাওয়ার পরে ওদের মধ্যে কেউ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে অথবা কেউ তলিয়ে যাবে ঋণের অতলে। কিন্তু ঋণ অবশ্যই অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে। কিন্তু সাইড এফেক্ট ছাড়া নয়।

অপরিনামদর্শী ঋণগ্রহণ মার্কিন অর্থনীতিকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। এই ব্যাপারে ব্যাঙ্কের চেয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে দোষারোপ করা হয় অনেক বেশি। এটা যথার্থ, কেননা সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে অনেকটাই রেগুলেটরি। যদি অন্যায্য আচরণ হয়, সেটা প্রতিকার করা। গ্রামীন ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক। গ্রামীন ব্যাঙ্ককে সংশোধন করা অথবা এর অনিয়ম নিয়ে একটা গ্রহনযোগ্য তদন্ত করা যেত, কিন্তু মহাজোট সরকার সেটা করেনি এবং হয়ত করবেও না। এই সরকারের সেই মেধা আছে, সেটাও মনে হয় না। ব্যাংকের প্রধানের "চাকরি নট" করে আর যাই হোক ক্ষুদ্রঋণের ভুক্তভোগীদের উপকার হয় না।

ইউনূস সাহেবের বহিষ্কারকে অনেকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বলেছেন কেউ কেউ। উনি ১/১১ পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন, মার্কিনিদের পছন্দের লোক, বর্তমান পৃথিবীর বাস্তবতায় আমেরিকা আর সামরিক শাসন চায় না, এই ধরনের “সুশীল” শাসকই তাদের পছন্দ। এটা আমি মানতাম, কিন্তু ইউনূস সাহেবকে পদচ্যুত করে আর চার-পাঁচটা মামলা দিয়ে তাঁর কী রাজনৈতিক ক্ষতি হোলো সেটা কেউ খুলে বলেলনি। আর ইউনূস সাহেব ছাড়াও মার্কিনিদের আরো পছন্দের লোক আছে দেশে। বাকিরা সবাই কেন সরকারের কোপানলে নেই?

৭০ বছর বয়েসে কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়া শুধু মার্কিনিদের সমর্থনে তিনি ফেসবুক আর সেনাসমর্থিত বিপ্লব করে ফেলবেন এটা মনে হয় না। আরব দেশের বাস্তবতা আর আমাদের বাস্তবতা এক নয়, আমাদের দেশের মানুষ শাসককুলের ভুলের পরিণাম তাদেরকে অচিরেই ধরিয়ে দেয়, সেটা ভোটে হোক আর রাজপথেই হোক। ইউনূস সাহেব সেটা বুঝেন বলেই ১/১১ পরে তিন মাসের বেশি রাজনীতি করেন নি।

ক্ষুদ্রঋণের ভুক্তভোগীদের ত্রানের জন্য নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল নয়, তাহলে ইউনূস সাহেবের এই পদচ্যুতি কেন?


শান্তিতে নোবেল প্রাইজ কোনো মহার্ঘ্য বস্তু নয়, অশান্তি তৈরি করে সেটাতে দুই ফোঁটা জল ঢেলে অনেকেই শান্তির নোবেল বাগিয়েছেন। আবার সারাজীবন মানুষের জন্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মাদার টেরেসাও পেয়েছেন এই পদক। শান্তির নোবেল বিতর্কের উর্ধ্বে নয়। ইউনূস সাহেব নোবেল পাওয়ার পরে উনাকে দেশের পত্রিকাগুলো নব্যুওয়াত প্রাপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে, ঠিক যেমনি বাংলাদেশ দল একটা খেলায় জিতলে তাদের আকাশে তোলা হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর খেলা নিয়ে মাথাব্যথা নেই, শোনা যায় উনি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির জন্য নোবেলের তদবীর করেছিলেন। উনার প্রধান উকিলও মনে করেন ইউনূসের আগেই শেখ হাসিনার নোবেল পাওয়া উচিত ছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির ব্যাপারে উনি নোবেল পেতে পারেন, এখনো পারেন। ভবিষ্যতে শান্তি আনব, এইজন্য বাকিতে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন ওবামা, সেই তুলনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনা অনেক সলিড কাজ। তবে শেখ হাসিনা নোবেল পাওয়ার আগে ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তিটা ভালো হয়নি ওনার জন্য। মালিকের ছেলের আগে বুয়ার ছেলে বৃত্তি পেলে বুয়ার “চাকরি নট” হতে পারে।

তাই কী হচ্ছে আসলে?

7 comments:

বন্ধন-৬৯ said...

অপূর্ব।

Rasel said...

ভাল বলেছেন ভাই ।

manila said...

দারুন হইছে...

তাসনীম said...

test

তৃষিয়া said...

নোবেলের শোকে হাসিনা এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন- এটা একটা কষ্টকল্পনা মনে হয় আমার কাছে। একদিকে হাসিনা আইন দেখাচ্ছেন, ওদিকে ইউনূসের পক্ষে লোকে বলছে একজন নোবেলবিজয়ী সম্মানী লোকের অসম্মান করা অন্যায়। দুই পক্ষের যুক্তি অনেকক্ষেত্রেই এক লাইনের না। ডঃ ইউনূস নিজের বিপদ ডেকে এনেছেন রাজনীতিতে নামার আশা ব্যক্ত করে। হাসিনা-খালেদার বিকল্প খোঁজে এমন লোকের অভাব নেই দেশে। সেখানে ইউনূসের রাজনীতিতে নামা অবশ্যই এদের জন্য আশংকাজনক। তাই আইনের প্যাঁচে ফেলে তাঁকে গ্রামীণ থেকে সরানো, তাঁর ইমেজ খারাপ করার চেষ্টা। হাসিনার এই উদ্যোগে ইউনূসের সমালোচকদেরও খুশি হওয়ার কারণ দেখি না। নিজের লেজে পাড়া না পড়লে আমাদের পলিটিশিয়ানরা আইন বোঝে না। হাসিনার পিতৃহত্যার প্রতিশোধের কল্যাণে আমরা বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার পাই, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঝুলতেই থাকে। ইউনূসের বেলায় যেহেতু তিনি আইন বুঝতে পারছেন, বুঝতে হবে এখানেও তার লেজে পাড়া পড়েছে ঠিকই। এখন আম্রিকার কামড় খেয়ে এই বেদনা প্রশমিত হয় কি না সেটাই দেখার বিষয়।

Barsha Rain said...

আমার ধারণা তত্ত্বাবধায়ক সরকার হটানোর প্রথম স্টেপ এটি আর শেয়ার বাজার কেলেংকারি ঢাকা।

Anonymous said...

চমৎকার!